পাকিস্তান ও আফগানিস্তানের মধ্যে চলমান লড়াই শনিবার তৃতীয় দিনে প্রবেশ করেছে। পাকিস্তান থেকে আবারও হামলা শুরুর খবর বিবিসিকে নিশ্চিত করেছেন আফগানিস্তানের খোস্ত এলাকার তালেবান সরকারি কর্মকর্তারা। তালেবান সরকারের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলীয় অঞ্চলের মানসুরি কর্পসের মুখপাত্র আব্দুল হক ফিদা বিবিসিকে বলেন, খোস্ত এবং ট্যাঙ্ক এলাকায় আবারও অভিযান শুরু হয়েছে ও লড়াই চলছে। আফগানিস্তানের সঙ্গে চলমান যুদ্ধে এখন পর্যন্ত দেশটির ৩৩১ জন যোদ্ধা নিহত হয়েছে বলে দাবি করেছে পাকিস্তান। পাকিস্তানের তথ্যমন্ত্রী আতাউল্লাহ তারার এ তথ্য জানিয়েছেন। এদিকে আফগানিস্তানের জালালাবাদ শহরে পাকিস্তানের একটি যুদ্ধবিমান বিধ্বস্ত হয়েছে। বিমানের পাইলটকে জীবিত অবস্থায় আটক করা হয়েছে। শনিবার আফগান সামরিক বাহিনী ও পুলিশ এ তথ্য নিশ্চিত করেছে। বিমানটি বিধ্বস্ত হওয়ার ঠিক আগমুহূর্তে পাইলট প্যারাসুট দিয়ে অবতরণ করেন। এর পরই তাকে আটক করা হয়। খবর ডন ও টোলো নিউজের।
পাকিস্তানের তথ্যমন্ত্রী জানিয়েছেন, তাদের নিরাপত্তা বাহিনী আফগানিস্তানে বহু তালেবান যোদ্ধাকে হত্যা করেছে। তার দেওয়া সর্বশেষ তথ্যে বলা হয়েছে, এখন পর্যন্ত ৩৩১ জন আফগান তালেবান যোদ্ধা নিহত এবং ৫০০ জনের বেশি আহত হয়েছে। তথ্যমন্ত্রী আরও দাবি করেন, পাকিস্তানি বাহিনী ১০৪টি তালেবান চেকপোস্ট, ১৬৩টি ট্যাংক ও সাঁজোয়া যান ধ্বংস করেছে এবং আরও ২২টি চেকপোস্ট দখলে নিয়েছে। আলজাজিরা এই তথ্যগুলো স্বাধীনভাবে যাচাই করতে পারেনি। বৃহস্পতিবার থেকে নতুন করে সংঘাতে জড়িয়ে যায় আফগানিস্তান ও পাকিস্তান। পাকিস্তানের সামরিক বাহিনী দাবি করেছে, তাদের পরিচালিত অপারেশন গজব-লিল হক অভিযান শুরু করে। দুদেশের মাঝে এখনো উত্তেজনা চলছে। আফগান পুলিশের মুখপাত্র তায়েব হাম্মাদ বলেন, জালালাবাদ শহরে পাকিস্তানের একটি যুদ্ধবিমান ভূপাতিত করা হয়েছে। এটির পাইলটকে জীবিত আটক করা হয়েছে। পূর্ব আফগানিস্তানের সামরিক মুখপাত্র ওয়াহিদুল্লাহ মোহাম্মদী বলেন, আফগান বাহিনী পাকিস্তানি যুদ্ধবিমানটি ভূপাতিত করেছে। পাইলট এখন তাদের হেফাজতে রয়েছেন।
এএফপির এক সাংবাদিক বলেন, তিনি জালালাবাদের আকাশে একটি যুদ্ধবিমান উড়ে যাওয়ার শব্দ শোনেন। এর কিছুক্ষণ পরই শহরের বিমানবন্দরের দিক থেকে দুটি বিকট বিস্ফোরণের শব্দ শোনা যায়। এর পরপরই যুদ্ধবিমান বিধ্বস্ত হওয়ার ঘোষণা আসে। এ ঘটনার বিষয়ে পাকিস্তানের সামরিক বাহিনী বা তথ্য মন্ত্রণালয় তাৎক্ষণিকভাবে এএফপির মন্তব্যের অনুরোধে সাড়া দেয়নি। এদিকে পাকিস্তানের খাইবার পাখতুনখোয়া
প্রদেশের মিরানশাহ ও স্পিনওয়াম এলাকায় সামরিক ঘাঁটিতে ড্রোন হামলা চালিয়েছে আফগান সেনারা। শনিবার আফগান গণমাধ্যম টোলো নিউজের বরাতে আলজাজিরা এ খবর জানিয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত বৃহস্পতিবার রাতে পাকিস্তান বিমানবাহিনীর হামলার পাল্টা জবাব হিসেবে তালেবান সরকার এ অভিযান চালায়। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় এই সংঘাত নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে জরুরি আলোচনার আহ্বান জানালেও দুই দেশ সীমান্তে একে অপরের বিভিন্ন স্থাপনায় হামলা অব্যাহত রেখেছে বলে খবর পাওয়া গেছে।
শুক্রবার পাকিস্তানের বিমান কাবুল ও কান্দাহারসহ আফগানিস্তানের বিভিন্ন স্থানে তালেবান সামরিক স্থাপনা ও সীমান্ত চৌকিতে আঘাত হেনেছে। গত কয়েক বছরের মধ্যে প্রতিবেশী দেশটির এত গভীরে পাকিস্তান আর কখনো হামলা করেনি বলে জানিয়েছেন কর্মকর্তারা। ইসলামাবাদ অভিযোগ করেছে, তালেবানরা তাদের ভূখণ্ডে তেহরিক-ই-তালেবান পাকিস্তান (টিটিপি) জঙ্গিদের আশ্রয় দিচ্ছে, যারা পাকিস্তানে নানান সন্ত্রাসী কার্যক্রমে যুক্ত। তবে তালেবান এই অভিযোগ অস্বীকার করে বলেছে, পাকিস্তান তাদের ব্যর্থতা ঢাকতে আফগানিস্তানকে দায়ী করছে। তারা ইসলামাবাদের হামলাকে তাদের সার্বভৌমত্বের ওপর আঘাত দিয়ে এর নিন্দা জানিয়েছে। লড়াই থামানোর লক্ষ্যে শুক্রবার রাত থেকে কূটনৈতিক তৎপরতা গতি পেয়েছে। আফগান পররাষ্ট্রমন্ত্রী আমির খান মুত্তাকি সৌদি আরবের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে টেলিফোনে উত্তেজনা কমানোর বিষয়ে আলাপ করেছেন। ইউরোপীয় ইউনিয়ন, জাতিসংঘ, রাশিয়া ও চীন উভয় পক্ষকে অবিলম্বে শত্রুতা বন্ধ করে সংলাপে বসার আহ্বান জানিয়েছে। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র জানিয়েছে, তারা হামলার বিরুদ্ধে পাকিস্তানের আত্মরক্ষার অধিকারকে সমর্থন করে। মার্কিন কর্মকর্তাদের মতে, পাকিস্তান এই পরিস্থিতিতে আগ্রাসনকারী নয় বরং নিজেদের নিরাপত্তা চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় চাপের মুখে রয়েছে। এর মধ্যেও সীমান্তে রাতভর গোলাগুলি অব্যাহত ছিল। পাকিস্তানি নিরাপত্তা সূত্রগুলো বলছে, তাদের গজব লিল হক অভিযানে তালেবানের একাধিক চৌকি ও ক্যাম্প ধ্বংস হয়েছে। উভয় পক্ষই একে অপরের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি করার দাবি করেছে, তবে রয়টার্স স্বতন্ত্রভাবে সেসব দাবি যাচাই করতে পারেনি। পাকিস্তান বলছে, তাদের ১২ জন সৈন্য এবং ৩৩১ জন তালেবান সদস্য নিহত হয়েছে। বিপরীতে তালেবান দাবি করেছে, তাদের ১৩ জন যোদ্ধা এবং পাকিস্তানের ৫৫ জন সৈন্য প্রাণ হারিয়েছে। এর বাইরে খোস্ত ও পাক্তিকায় ১৯ বেসামরিক নাগরিক নিহতেরও খবর দিয়েছে তালেবান।
পাকিস্তানের প্রতিরক্ষা মন্ত্রী খাজা মুহাম্মদ আসিফ বলেছেন, আমাদের ধৈর্যের বাঁধ ভেঙে পড়েছে। আর তালেবান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সিরাজুদ্দিন হাক্কানি এক বক্তৃতায় সতর্ক করে দিয়ে বলেছেন, এই সংঘাত চড়া মূল্য বয়ে আনবে। সামরিক সক্ষমতার দিক দিয়ে পাকিস্তান অনেক এগিয়ে থাকলেও দীর্ঘ দুই দশক মার্কিন নেতৃত্বাধীন বাহিনীর বিরুদ্ধে লড়াই করা তালেবান যোদ্ধারা গেরিলা যুদ্ধে অত্যন্ত অভিজ্ঞ। এদিকে আফগানিস্তানের সরকারের হামলার বিরুদ্ধে আত্মরক্ষায় পাকিস্তানের অধিকারের প্রতি সমর্থন জানিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। এদিকে আফগানিস্তানের বিরুদ্ধে যুদ্ধে দেশটির প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ ও সেনাপ্রধান আসিম মুনিরের ভূমিকার ভূয়সী প্রশংসা করেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প।
শনিবার ওয়াশিংটনে হোয়াইট হাউসের সাউথ লনে মার্কিন প্রেসিডেন্টের কাছে জানতে চাওয়া হয়, পাকিস্তান ও আফগানিস্তানের মধ্যকার সংঘাতে তিনি হস্তক্ষেপ করবেন কি না। জবাবে ট্রাম্প বলেন, আমি করতেও পারি। তবে আপনারা জানেন, পাকিস্তানের সঙ্গে আমার সম্পর্ক খুবই ভালো।
প্রকাশক ও সম্পাদক
মোঃ শাহিন হোসেন
www.dainikabhaynagar.com