‘আগে প্রচুর ঈদ কার্ড বিক্রি হতো। এমন হয়েছে যে আমরা ইফতারের প্রস্তুতি নিচ্ছি; দোকান বন্ধ করে দেবো তবুও ক্রেতাদের চাপে দোকান খোলা রাখা লাগতো। এমন দিন ছিল না যে ইফতারের সময়েও ১০ থেকে ২০ জন ক্রেতাকে নিয়ে ইফতার করিনি। তখন তো মানুষের আবেগ ছিল। ঈদের শুভেচ্ছা কার্ড কিনতে রীতিমতো লাইন লেগে যেতো। তবে এখন আর বিক্রি নেই। কার্ড রাখলেও মানুষ কেনেন না। মানুষের ভালোবাসা আর আবেগ; সবকিছু দখল করেছে মোবাইল ফোন।’
এভাবেই কালের খেয়ায় হারিয়ে যাওয়া ঈদের শুভেচ্ছা কার্ডের জৌলুস থাকা দিনের স্মৃতিচারণ করছেন রাজধানীর আজাদ প্রোডাক্টসের বিক্রেতা আলী আজম।
মঙ্গলবার (১৭ মার্চ) দুপুরে ঢাকা পোস্টের সঙ্গে ঈদের শুভেচ্ছা কার্ড বিক্রির নানা প্রসঙ্গ নিয়ে আলাপকালে এসব কথা বলেন আজম।
আলী আজম এই আজাদ প্রোডাক্টসেই কাটিয়ে দিয়েছেন ২৬টি বছর। এই সময়কালে তিনি স্বাক্ষী হয়েছেন এ খাতের বাণিজ্য, সংকট ও সম্ভাবনার বিচিত্র অধ্যায়।
ঢাকা পোস্টের সঙ্গে আলাপকালে আলী আজম বলেন, আগে স্কুল-কলেজের ছেলে মেয়েরা দলবেঁধে ঈদের শুভেচ্ছা কার্ড কিনতো। পাড়া মহল্লায় এসব কার্ডের দোকান বসতো। ঈদের শুভেচ্ছা কার্ড, ভিউ কার্ড, নায়ক-নায়িকার ছবি, স্টিকার সহ নানা আইটেম তৈরি হতো। এসবের চাহিদাও ছিল প্রচুর। কিন্তু এখন আর এসব বিক্রি হয় না। মহল্লায় দোকান বসে না। মানুষ এখন মোবাইল ফোনে আসক্ত। পরস্পরের প্রতি শ্রদ্ধাবোধ, ভালোবাসা বা আবেগ এগুলোর সবই এখন ডিজিটাল কার্ডে সীমাবদ্ধ।
তিনি বলেন, মানুষ এখন আর মনের গোপন কথাটি বলতে পারে না। অনেক বেশি কথা বলার সুযোগ থাকার পরেও একটি কথা যে কতটা ভারী হতে পারে; হৃদয়স্পর্শী হতে পারে এটা এখনকার জেনারেশন উপলব্ধি করতে পারে না। আমাদের সময় দেখেছি মনের সঙ্গোপনে লুকিয়ে রাখা কথা এসব কার্ডে লিখে প্রিয়জনকে দেওয়া হতো। ছোটরা বড়দের লিখতো। বড়রাও ছোটদের এসব কার্ডে অনুপ্রেরণার দুটি লাইন লিখে দিতো। কিন্তু এসব এখন কেবলই স্মৃতি।
এই বিক্রেতা বলেন, এ বছর অল্প কিছু কার্ড তৈরি করা হয়েছে। যা বিক্রি হয়েছে সেটা নগণ্য। বলার মতো না। আগে যেখানে ক্রেতাদের কাছে বিক্রি করে অবসর পেতাম না, কিন্তু এখন সেখানে ক্রেতাই নেই।
পুরানা পল্টনের বেশকিছু কার্ডের দোকানে ঘুরে দেখা গেছে, বর্তমানে এসব ঈদের শুভেচ্ছা কার্ড ১০, ১৫ এবং ২০ টাকায় পাওয়া যাচ্ছে। বেশিরভাগ দোকানি বলছেন, ছাপানো হয়েছে অল্পকিছু তাও বিক্রি হয়নি। আবার বিক্রি না হওয়ায় অনেক দোকানে এসব কার্ড রাখাও হয়না। লম্বা সময় বিভিন্ন দোকানে অপেক্ষা করেও একটি কার্ডও বিক্রি হতে দেখা যায়নি।
রাজীব নামের আরেক বিক্রেতা বলেন, এসব কার্ড ছাপালে এখন লোকসান হয়। কারণ ছাপালেও বিক্রি হয় না। যা বিক্রি হয় তা দিয়ে ছাপার খরচ ওঠে না। শুধু শুধু ছাপিয়ে লোকসান হয়। এখন মানুষ এসব দিয়ে শুভেচ্ছা বার্তা দেয় না। এসব কার্ডের বাজার ধরেছে ডিজিটাল কার্ড।
পল্টনের এক স্টেশনারি দোকানের মালিক সুমন শাহরিয়ার বলেন, একসময় ঈদের এক সপ্তাহ আগে থেকেই কার্ড বিক্রি শুরু হতো। দিনে শত শত কার্ড বিক্রি করেছি। এখন সেই দিন নেই।
৯০ এর দশক এবং ২০১০ সালের পূর্বে এসব কার্ডের ব্যাপক চাহিদা ছিল জানিয়ে ইফতেখার নামের একজন বলেন, এগুলো এখন আর চলে না। আমরা আগে এসব কার্ড কিনেছি, পরিচিতদের দিয়েছি। প্রেমিকাকেও দিয়েছি। কিন্তু এখন এসব চলে না। আমরা আগে মোবাইল ফোনে এসএমএস কিনেও সবাইকে পাঠাতাম। সেই সংস্কৃতিও হারিয়ে গেছে। এখন তো শুধুই একটা ডিজিটাল কার্ড পাঠিয়েই শুভেচ্ছা বিনিময় হয়।
ডিজিটাল গ্রাফিক্স ও তথ্যভিত্তিক প্ল্যাটফর্ম সারাংশের প্রতিষ্ঠাতা এহসান হাবীব সুমন বলেন, ডিজিটাল যুগে মানুষের যোগাযোগের ধরন পুরোপুরি বদলে গেছে। এখন কেউ আর আলাদা করে ঈদ কার্ড ডিজাইন করে প্রিন্ট করাতে চায় না। বরং ফেসবুক পোস্ট, স্টোরি বা হোয়াটসঅ্যাপ মেসেজের জন্য দ্রুত ডিজাইন তৈরি করাই বেশি জনপ্রিয়।
তিনি বলেন, ডিজিটাল গ্রাফিক্সের সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো কম সময়, কম খরচ এবং তাৎক্ষণিকভাবে হাজার মানুষের কাছে পৌঁছানো যায়। ফলে ঐতিহ্যবাহী ঈদ কার্ডের জায়গা স্বাভাবিকভাবেই কমে গেছে।
তবে ব্যক্তিগত আবেগের দিকটি তুলে ধরে তিনি বলেন, কাগজের কার্ডে যে ব্যক্তিগত স্পর্শ ও অনুভূতি থাকে, সেটা ডিজিটাল মাধ্যমে পুরোপুরি আসে না। তাই অনেকেই এখনও বিশেষ মানুষের জন্য আলাদা করে কাস্টম ডিজিটাল কার্ড তৈরি করেন।
প্রকাশক ও সম্পাদক
মোঃ শাহিন হোসেন
www.dainikabhaynagar.com