মধ্যপ্রাচ্যের উত্তপ্ত ভূরাজনৈতিক বাস্তবতায় ইরানের সাম্প্রতিক অবস্থান নতুন করে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে আলোচনার জন্ম দিয়েছে। রাজধানী তেহরান-কে ঘিরে সামরিক উত্তেজনা, ড্রোন হামলা ও আধুনিক সমরাস্ত্রের প্রদর্শন যখন পরিস্থিতিকে ক্রমেই জটিল করে তুলছে, তখন ইরানের রাষ্ট্রপতি মাসুদ পেজেশকিয়ান-এর দৃঢ় অবস্থান বিশ্বকে একটি স্পষ্ট বার্তা দিয়েছে—ইরান কোনো চাপের মুখে নতি স্বীকার করবে না।
রাষ্ট্রপতির বক্তব্যে ‘ঈমান’ ও আত্মত্যাগের যে বিষয়টি সামনে এসেছে, তা অনেকের কাছে আবেগনির্ভর মনে হলেও বাস্তবতায় এর ভিন্ন মাত্রা রয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা ও সামরিক চাপের মধ্যে থেকেও ইরান টিকে আছে মূলত তাদের আদর্শিক দৃঢ়তা ও জাতীয় ঐক্যের ওপর ভর করে। ফলে এই বক্তব্য কেবল রাজনৈতিক বক্তব্য নয়, বরং এটি অভ্যন্তরীণ সংহতি বজায় রাখার একটি কৌশল হিসেবেও বিবেচিত হচ্ছে।
বিশ্লেষকদের মতে, এই অবস্থানকে দুটি গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টিকোণ থেকে দেখা প্রয়োজন। প্রথমত, জাতীয় মনোবল ধরে রাখা। যেকোনো সংঘাতময় পরিস্থিতিতে সাধারণ মানুষের আত্মবিশ্বাস অটুট রাখা রাষ্ট্রের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। রাষ্ট্রপতির বক্তব্য সেই লক্ষ্যেই জাতির আত্মসম্মান ও বিশ্বাসের জায়গাকে জোরালোভাবে তুলে ধরেছে।
দ্বিতীয়ত, ইরানের দীর্ঘদিনের ‘প্রতিরোধ নীতি’ বা তথাকথিত “Axis of Resistance”-এর ধারাবাহিকতা। ইরান নিজেকে কেবল একটি রাষ্ট্র হিসেবে নয়, বরং একটি আদর্শিক শক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে চায়। তাদের মতে, এই লড়াই কেবল ভূখণ্ড রক্ষার নয়, বরং একটি বিশ্বাস ও রাজনৈতিক দর্শনের অস্তিত্ব রক্ষার লড়াই।
এখানে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, ইরান তাদের সামরিক কৌশলে ‘অপ্রতিসম যুদ্ধ’ (Asymmetric Warfare) পদ্ধতির ওপর জোর দিয়ে থাকে। প্রযুক্তিগতভাবে শক্তিশালী প্রতিপক্ষের মোকাবেলায় এই কৌশল কার্যকর হতে পারে, যেখানে সরাসরি শক্তির বদলে মনোবল, কৌশল ও দীর্ঘস্থায়ী প্রতিরোধ ভূমিকা রাখে।
তবে বাস্তবতা হলো, আধুনিক যুদ্ধক্ষেত্রে শুধু আবেগ বা আদর্শ দিয়ে জয়লাভ করা কঠিন। ‘আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স’, ড্রোন প্রযুক্তি ও প্রিসিশন গাইডেড অস্ত্রের যুগে সামরিক সক্ষমতার বাস্তব প্রয়োগই নির্ধারণ করে ফলাফল। সেই দিক থেকে ইরানের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হবে তাদের আদর্শিক শক্তিকে আধুনিক সামরিক প্রযুক্তির সঙ্গে কার্যকরভাবে সমন্বয় করা।
ইতিহাস বলে, ভিয়েতনাম বা আফগানিস্তানের মতো উদাহরণে দুর্বল পক্ষও শক্তিশালী প্রতিপক্ষকে চ্যালেঞ্জ জানিয়েছে মূলত মনোবল ও কৌশলের জোরে। ইরানের বর্তমান অবস্থানও সেই বাস্তবতার প্রতিফলন হতে পারে।
সবশেষে বলা যায়, মাসুদ পেজেশকিয়ান-এর বক্তব্য শুধুই আবেগতাড়িত রাজনৈতিক ঘোষণা নয়; বরং এটি একটি রাষ্ট্রের টিকে থাকার সংকল্প ও কৌশলগত বার্তার সমন্বয়। এখন দেখার বিষয়, এই আদর্শিক দৃঢ়তা বাস্তব সামরিক ও কূটনৈতিক ময়দানে কতটা কার্যকরভাবে প্রয়োগ করা যায়।
প্রকাশক ও সম্পাদক
মোঃ শাহিন হোসেন
www.dainikabhaynagar.com