বাংলাদেশের তৈরি পোশাক খাত বর্তমানে বহুমাত্রিক সংকটের মুখোমুখি। শিল্প সংশ্লিষ্টদের মতে, বৈশ্বিক অর্থনৈতিক মন্দা, উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি এবং নীতি সহায়তার ঘাটতির কারণে খাতটি এক গুরুত্বপূর্ণ মোড়ের দিকে এগোচ্ছে।
জাতীয় রাজস্ব বোর্ডে আয়োজিত প্রাক-বাজেট আলোচনায় শীর্ষ শিল্প সংগঠন বিজিএমইএ জানিয়েছে, গত তিন বছরে প্রায় ৪০০টি কারখানা বন্ধ হয়ে গেছে এবং আরও অনেক প্রতিষ্ঠান আর্থিক ঝুঁকিতে রয়েছে। শিল্প নেতারা বলেন, টেকসই প্রবৃদ্ধি নিশ্চিত করতে হলে এখনই কার্যকর নীতি সহায়তা, কর কাঠামোর সংস্কার এবং ব্যয় নিয়ন্ত্রণ জরুরি।
বিজিএমইএ সভাপতি মাহমুদ হাসান খান জানান, বৈশ্বিক বাজারে চাহিদা কমে যাওয়া, ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং বাণিজ্যিক শুল্কের চাপের কারণে রফতানি প্রবৃদ্ধি কমে গেছে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরের ফেব্রুয়ারিতে রফতানি আয় প্রায় ৩ দশমিক ৭৩ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে, যা শিল্পের ওপর সরাসরি প্রভাব ফেলছে।
তিনি বলেন, অনেক কারখানা পূর্ণ সক্ষমতার নিচে পরিচালিত হওয়ায় স্থায়ী ব্যয় বেড়ে যাচ্ছে এবং লাভজনকতা কমছে। একই সঙ্গে উৎপাদন ব্যয় বেড়ে যাওয়াও বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। সংশ্লিষ্টদের তথ্য অনুযায়ী, ঋণের সুদের হার ১২ থেকে ১৫ শতাংশে পৌঁছেছে, গ্যাসের দাম গত কয়েক বছরে প্রায় ২৮৬ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে, বিদ্যুতের দাম বেড়েছে ৩৩ শতাংশ এবং ২০২৪ সালে ন্যূনতম মজুরি ৫৬ শতাংশ বৃদ্ধি করা হয়েছে। এছাড়া চট্টগ্রাম বন্দরের ট্যারিফ ৪১ শতাংশ বেড়েছে এবং রফতানি প্রণোদনা উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে।
শিল্প উদ্যোক্তারা মনে করছেন, এসব কারণে আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা কমে যাচ্ছে। এ পরিস্থিতি মোকাবেলায় বিজিএমইএ সরকারের কাছে বেশ কিছু প্রস্তাব তুলে ধরেছে। এর মধ্যে রয়েছে নগদ সহায়তার ওপর কর কর্তন প্রত্যাহার, উৎসে কর কমানো, সৌরবিদ্যুৎ ব্যবহারে শুল্ক সুবিধা এবং কাঁচামালের ওপর কর কাঠামো সহজীকরণ।
একই আলোচনায় বাংলাদেশ টেক্সটাইল মিলস অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি শওকত আজিজ রাসেল বলেন, উৎপাদন চেইনের বিভিন্ন ধাপে একাধিকবার কর আরোপ শিল্পের জন্য বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। তিনি আরও বলেন, বিশ্ববাজারে অধিকাংশ পোশাক এখন ম্যান-মেড ফাইবারভিত্তিক হলেও বাংলাদেশ এখনও এ খাতে পিছিয়ে রয়েছে। এ খাতে কর সুবিধা দেওয়া হলে নতুন প্রবৃদ্ধির সুযোগ তৈরি হতে পারে।
জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের চেয়ারম্যান আবদুর রহমান খান জানান, সরকার কর ব্যবস্থাকে আরও সহজ ও ডিজিটাল করতে কাজ করছে। ই-ট্যাক্স রিটার্ন ব্যবস্থা চালু, ব্যাংক তথ্য সংযুক্তিকরণ এবং কর ফেরত প্রক্রিয়া সহজ করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। তিনি বলেন, শিল্প সংশ্লিষ্টদের প্রস্তাব গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা হবে।
বিশ্লেষকদের মতে, বাংলাদেশের তৈরি পোশাক খাত বর্তমানে একটি গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণে রয়েছে। যথাযথ নীতি সহায়তা, কর কাঠামোর যৌক্তিক সংস্কার এবং প্রযুক্তিনির্ভর বিনিয়োগ ছাড়া এই খাতের টেকসই প্রবৃদ্ধি বজায় রাখা কঠিন হবে। আসন্ন বাজেট তাই শুধু অর্থনৈতিক পরিকল্পনা নয়, বরং দেশের প্রধান রফতানি খাতের ভবিষ্যৎ নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
প্রকাশক ও সম্পাদক
মোঃ শাহিন হোসেন
www.dainikabhaynagar.com