নড়াইল সদর উপজেলা জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের উপ-সহকারী প্রকৌশলী এহসানুল হকের বিরুদ্ধে বিস্তর অনিয়ম, দুর্নীতি ও ক্ষমতার অপব্যবহারের গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। দীর্ঘ ৯ বছর ধরে একই কর্মস্থলে বহাল থেকে তিনি পুরো অফিসকে দুর্নীতির আখড়ায় পরিণত করেছেন বলে অভিযোগ করেছেন স্থানীয় ভুক্তভোগীরা।
সম্প্রতি প্রধান প্রকৌশলী, জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর, কাকরাইল, ঢাকা বরাবর লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন নড়াইল সদরের বিছালী ইউনিয়নের মির্জাপুর গ্রামের আব্দুল জলিল। অভিযোগের অনুলিপি দুদক, খুলনা সার্কেল ও নড়াইল নির্বাহী প্রকৌশলীর দপ্তরেও পাঠানো হয়েছে।
অভিযোগপত্রে বলা হয়েছে, এহসানুল হক বিগত সরকারের আমলে রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে ৯ বছর ধরে নড়াইল সদরে পোস্টিং নিয়ে আছেন। এই সময়ে তিনি ঠিকাদারদের সঙ্গে যোগসাজশে একের পর এক প্রকল্পের টাকা লুটপাট করেছেন।
নড়াইল জেলা পরিষদের জঙ্গলগ্রাম ও তপনবাগের ২টি পুকুরে কোনো কাজ না করেই ঠিকাদারের সাথে ভাগবাটোয়ারার মাধ্যমে মোটা অঙ্কের টাকা আত্মসাৎ করার অভিযোগ উঠেছে। কাজ না হওয়ায় পুকুর দুটি এখনো জেলা পরিষদকে বুঝিয়ে দেওয়া যায়নি। ফলে স্থানীয় প্রভাবশালীরা তা দখল করে নিয়েছে। পানির অভাবে এলাকাবাসী নানা রোগব্যাধিতে ভুগছেন। বিষয়টি নিয়ে গণমাধ্যমে সংবাদ প্রকাশ হলেও ক্ষমতার দাপটে সব ধামাচাপা দিয়েছেন এই প্রকৌশলী।
বিগত স্যানিটেশন প্রকল্পের ২টি বরাদ্দের রিং ও স্ল্যাবের টাকা ভুয়া ভাউচারে তুলে নেওয়া হয়েছে। ‘সমগ্র দেশ’ প্রকল্পের অধীনে বিছালী ইউনিয়নের জন্য বরাদ্দকৃত সব নলকূপ ৪০-৫০ হাজার টাকা ঘুষের বিনিময়ে শুধু মির্জাপুর গ্রামেই দেওয়া হয়েছে। যারা ঘুষ দিতে পারেননি, তাদের গ্রাম বঞ্চিত হয়েছে। গত ৭ বছরে মির্জাপুর গ্রামেই অস্বাভাবিক সংখ্যক টিউবওয়েল বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। অভিযোগ আছে, ২৫-৩০ হাজার টাকায় এসব টিউবওয়েল বিক্রি করা হয়েছে।
ঠিকাদারের সাথে ঘুষের বনিবনা না হওয়ায় ‘সমগ্র দেশ’ প্রকল্পের পাইপলাইনের স্থান তৎকালীন এমপির পিএস জাহিদুলের সাথে যোগসাজশে ইচ্ছাকৃতভাবে লবণাক্ত পানির এলাকায় দেওয়া হয়। ফলে কাজ বাস্তবায়ন হয়নি, জনগণ পানির কষ্টে ভুগছে।
সদর অফিস ভবন মেরামতের টাকা আত্মসাৎ করে জেলা পানি পরীক্ষাগার ভবন দখল করে রেখেছেন তিনি। চীফ ইঞ্জিনিয়ারের আদেশে ৯ মাস আগে আয়নাল হক নামে এক কর্মকর্তার পোস্টিং হলেও এহসানুল হক অবৈধভাবে ল্যাব অফিস ছাড়ছেন না। ফলে নড়াইলের পানি পরীক্ষা করতে খুলনায় যেতে হয়। দেরিতে পরীক্ষা হওয়ায় দূষিত পানি পান করে মানুষ অসুস্থ হচ্ছে।
জুয়েল নামে এক ঠিকাদারের সাথে যোগসাজশে ১১৪টি তারা নলকূপে নিম্নমানের মালামাল সরবরাহ করে মোটা অঙ্কের ঘুষ নিয়ে বিল ছাড় করা হয়েছে। বর্তমানে নলকূপগুলো অকেজো।
ভালো অবস্থায় থাকা অফিসের গেট ভেঙে সংস্কারের নামে কোনো কাজ না করেই ঠিকাদারের সাথে মিলে বিল তুলে নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে।
অভিযোগে আরও বলা হয়, এহসানুল হক ঠিকাদারদের কাছ থেকে উপঢৌকন হিসেবে ৩ লাখ টাকার মোটরসাইকেল, বাসা ও অফিসে এসি, এয়ারকুলার, ফ্রিজ, ফার্নিচারসহ বিভিন্ন আসবাবপত্র নিয়েছেন। দীর্ঘ ১০ বছরে ফ্যাসিস্ট সরকারের মদদে ছাত্রলীগ-যুবলীগের সাথে সিন্ডিকেট করে ১.৫ কোটি টাকা আত্মসাতের মাধ্যমে যশোরে নিজ এলাকায় তিনতলা বাড়ি করেছেন তিনি।
অফিসের একাধিক কর্মচারী নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, এহসানুল হক প্রায়ই দেরি করে অফিসে আসেন। কর্মচারীদের সাথে দুর্ব্যবহার করেন এবং অবৈধ বিলে ভয় দেখিয়ে স্বাক্ষর নেন। প্রতিবাদ করলে খাগড়াছড়ি বা বান্দরবান বদলির হুমকি দেন। সেবা নিতে আসা সাধারণ মানুষের সাথেও তিনি খারাপ ব্যবহার করেন।
অভিযোগকারী আব্দুল জলিল বলেন, “তিনি দম্ভ করে বলেন, চীফ ইঞ্জিনিয়ারও তাকে নড়াইল থেকে বদলি করতে পারবে না। ১০ বছরে কেউ পারেনি, এখনও পারবে না।”
এই দুর্নীতিবাজ ও অদক্ষ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় তদন্ত করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছেন ভুক্তভোগীরা। অভিযোগের বিষয়ে জানতে এহসানুল হকের মুঠোফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি। সরাসরি তার বক্তব্য নিতে তার অফিস কক্ষে গেলে তাকে খুঁজে পাওয়া যায়নি।
এ বিষয়ে নড়াইল জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের নির্বাহী প্রকৌশলী বলেন, অভিযোগের কপি পেয়েছি। ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে। তদন্ত সাপেক্ষে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
প্রকাশক ও সম্পাদক
মোঃ শাহিন হোসেন
www.dainikabhaynagar.com