ইতিহাসের কিছু মানুষ থাকেন, যাদের জীবন নিজেই এক একটি মহাকাব্য। কুড়িগ্রামের রৌমারী উপজেলার পাখীউড়া গ্রামের কিশমত আলী মাস্টার তেমনই এক অনন্য ব্যক্তিত্ব। তিনি একাধারে জাতীয় পর্যায়ের বক্সিং চ্যাম্পিয়ন, বীর মুক্তিযোদ্ধা এবং নিবেদিতপ্রাণ শিক্ষক। করাচির বক্সিং রিং থেকে শুরু করে মুক্তিযুদ্ধের রণাঙ্গন, এরপর গ্রামের শ্রেণিকক্ষে নতুন প্রজন্ম গড়ার সংগ্রাম—সব মিলিয়ে তার জীবন এক অনুপ্রেরণার নাম।
ষাটের দশকে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে বক্সিং খুব একটা পরিচিত খেলা ছিল না। পশ্চিম পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী বাঙালিদের শারীরিকভাবে দুর্বল মনে করত। সেই ধারণাকে চ্যালেঞ্জ জানিয়ে ১৯৬৭ সালে করাচিতে অনুষ্ঠিত ১৩তম জাতীয় মুষ্টিযুদ্ধ প্রতিযোগিতায় স্বর্ণপদক জয় করেন কিশমত আলী। ওই বিজয় শুধু একটি ক্রীড়া সাফল্য ছিল না, বরং বাঙালির আত্মমর্যাদা ও সামর্থ্যের প্রতীক হয়ে ওঠে।
১৯৭১ সালে মহান মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে কিশমত আলী গ্লাভস ছেড়ে হাতে তুলে নেন অস্ত্র। ১১ নম্বর সেক্টরের অধীনে রৌমারী মুক্তাঞ্চলে তিনি সম্মুখযুদ্ধে অংশ নেন। যুদ্ধক্ষেত্রে তার সাহসিকতা ও কৌশল মুক্তিযোদ্ধাদের অনুপ্রাণিত করেছিল। রিংয়ের ক্ষিপ্রতা ও আত্মবিশ্বাস তিনি কাজে লাগিয়েছিলেন দেশের স্বাধীনতার লড়াইয়ে।
দেশ স্বাধীন হওয়ার পরও থেমে থাকেননি তিনি। শিক্ষকতা পেশাকে বেছে নিয়ে তিনতেলী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে দীর্ঘ ২৮ বছর শিক্ষার্থীদের মাঝে জ্ঞানের আলো ছড়িয়ে দেন। সমাজে তিনি পরিচিত হয়ে ওঠেন “কিশমত মাস্টার” নামে। একজন ক্রীড়াবিদ ও যোদ্ধা থেকে তিনি হয়ে ওঠেন মানুষ গড়ার কারিগর।
বর্তমানে বয়সের ভারে নুয়ে পড়লেও কিশমত আলীর জীবনসংগ্রাম আজও মানুষের অনুপ্রেরণা হয়ে আছে। প্রচারের আলো থেকে দূরে থাকলেও তার অবদান স্থানীয় মানুষের হৃদয়ে গভীরভাবে জায়গা করে নিয়েছে। তিনি মনে করেন, “বক্সিং শুধু শক্তির খেলা নয়, এটি আত্মসম্মানের লড়াই। যে রিংয়ে মাথা উঁচু রাখতে পারে, সে দেশের জন্যও মাথা উঁচু রাখতে পারে।”
স্থানীয় ক্রীড়াপ্রেমী ও সচেতন মহল মনে করেন, কিশমত আলীর মতো মানুষদের রাষ্ট্রীয়ভাবে সম্মান জানানো উচিত। কারণ তার জীবন নতুন প্রজন্মকে শেখায়—সংগ্রাম, দেশপ্রেম ও আত্মমর্যাদার প্রকৃত অর্থ।
প্রকাশক ও সম্পাদক
মোঃ শাহিন হোসেন
www.dainikabhaynagar.com