
মোঃ ইসমাইল হোসেন
বেজেছে ভোটের ঘণ্টা। আসছে ১২ ফেব্রুয়ারি নির্বাচন। এবার শুধু সংসদ নির্বাচন নয়, একইদিনে হবে গণভোটও; যা দেশে প্রথমবারের মতো।
এর আগে আরও তিনবার গণভোট হয়েছিল বাংলাদেশে। তবে সেসব দিনে জাতীয় সংসদ নির্বাচন হয়নি। কেবল ‘হ্যা’/‘না’ ভোটের আয়োজন ছিল।
এবার মানিক মিয়া অ্যাভিনিউতে কারা যাচ্ছেন, সেই জনমত প্রয়োগের পাশাপাশি জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়নেই গণভোটের আয়োজন।
ভোটে নেই আওয়ামী লীগ, আছে ৫৬টি দল
আওয়ামী লীগের অংশগ্রহণ ছাড়াই প্রথমবারের মতো প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ কোনও জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পথে এগোচ্ছে দেশ।
গণঅভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত এই রাজনৈতিক দলটির কার্যক্রম নিষিদ্ধ থাকায় ইসি তাদের নিবন্ধন স্থগিত করেছে। এ কারণে তাদের ভোটে অংশ নেয়ার সুযোগ নেই।
অন্যদিকে, বিএনপি, জামায়াত, এনসিপি, জাতীয় পার্টি, জেপিসহ ৫৬টি দল রয়েছে, যারা ইসিতে নিবন্ধিত। দলগুলোর ভোটে অংশ নেয়ার ক্ষেত্রে কোনও বাধা নেই। এখন পর্যন্ত এসব দলের কোনোটি নির্বাচনে না যাওয়ার বিষয়ে জানায়নি।
এরমধ্যে নির্বাচন সামনে রেখে পাঁচটি জোট আলোচনায় এসেছে। এর মধ্যে রয়েছে যুগপথ আন্দোলনের সঙ্গীদের নিয়ে বিএনপির নেতৃত্বাধীন জোট, জামায়াতের নেতৃত্বে আটদলীয় জোট, জাপা (একাংশ) ও জেপির ‘জাতীয় গণতান্ত্রিক ফ্রন্ট’, এনিসিপি-এবি পাটি-রাষ্ট্র সংস্কার আন্দোলনের 'গণতান্ত্রিক সংস্কার জোট' এবং বামপন্থী দলগুলোর নতুন জোট 'গণতান্ত্রিক যুক্তফ্রন্ট'।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, মূল লড়াইটা হবে বিএনপি ও জামায়াতের মধ্যে। আর ‘জাতীয় গণতান্ত্রিক ফ্রন্ট’ ও 'গণতান্ত্রিক সংস্কার জোট' ভোটের প্রচারে গুরুত্ব পাবে বেশ।
এদিকে, এরশাদ ও হাসিনা আমলে ভোটে না যাওয়ার অভিজ্ঞতা রয়েছে দেশের অন্যতম প্রধান রাজনৈতিক দল বিএনপির।
অন্যদিকে, বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের সাড়ে তিন বছরের মাথায় অনুষ্ঠিত হওয়া ভোটেও ছিল আওয়ামী লীগের নৌকা।
এরশাদ আমলে ’৮৬ এর নির্বাচনে না যাওয়ার ঘোষণা দিয়েও পরে ভোটে অংশ নেয় আওয়ামী লীগ। পরে ’৮৮ এর নির্বাচনে প্রায় সব দলের সঙ্গে ভোট বর্জন করেছিল দলটিও।
এছাড়া, স্বাধীনতার পর অনুষ্ঠিত প্রথম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশগ্রহণ করতে পারেনি জামায়াত। জিয়াউর রহমানের অধীনে দ্বিতীয় সংসদ নির্বাচনে নিজেদের ব্যানারে ভোটে আসতে পারেনি তারা। সেবার ইসলামিক ডেমোক্রেটিক লীগ নামে একটি রাজনৈতিক প্ল্যাটফর্ম ভোটে এসেছিল, যেখানে জামায়াতসহ ইসলামপন্থী বিভিন্ন রাজনৈতিক দলগুলোকে একত্র করার প্রয়াস ছিল।
দলটি বিএনপির মতো শেখ হাসিনার অধীনে ২০১৪ ও ২০২৪ সালেও ভোটে যায়নি।
এরমধ্যে তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা প্রচলনের আন্দোলনের পটভূমিতে ’৯৬ এর ১৫ ফেব্রুয়ারি ৬ষ্ঠ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছিল। যেটিতে দলগুলোর বর্জনের মধ্য দিয়ে বিএনপি ক্ষমতায় এসে তত্ত্ববধায়ক সরকারব্যবস্থা প্রবর্তন করে এই সংসদ ভেঙে দেয়া হয়। এই সংসদ স্থায়ী ছিল মাত্র ১২দিন।
এক যুগেরও বেশি সময় পর নির্দলীয় সরকারের অধীনে ভোট
২০১১ সালের মে মাসে আদালত তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা বাতিল করলে বিএনপি, জামায়াত ও তাদের সমমনা দলগুলো এর বিরুদ্ধে আন্দোলন শুরু করে। কিন্তু আওয়ামী লীগ তাতে কর্ণপাত না করে ’১৪-এর জানুয়ারিতে ভোট করে। ’১৮ সালে শেখ হাসিনার অধীনে নির্বাচনে গিয়ে ‘রাতের ভোটে’ প্রতারিত হওয়ার অভিযোগ তোলে বিএনপিসহ অন্য দলগুলো। এরপর তারা তত্ত্ববধায়ক ছাড়া আর ভোটের পথে হাঁটেনি। কিন্তু শেখ হাসিনা নিজের সিদ্ধান্ত থেকে সরেননি পতন পর্যন্ত।
তার ক্ষমতাচ্যুতির পর আদালত তত্ত্ববধায়ক সরকারব্যবস্থা ফিরিয়ে দিলেও তা এখনই কার্যকর হচ্ছে না। যা হবে আগামী সংসদ থেকে। তবে গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে গঠিত নির্দলীয় সরকারই আয়োজন করতে যাচ্ছে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। এর মধ্য দিয়ে দীর্ঘ সময় পর আবার দলীয় সরকারের অধীনে ছাড়া ভোট দেখতে যাচ্ছে দেশ।
ছাব্বিশের ভোট
এই নির্বাচনে মনোনয়ন দাখিলের শেষ দিন আগামী ২৯ ডিসেম্বর, ৩০ ডিসেম্বর থেকে ৪ জানুয়ারি পর্যন্ত চলবে যাচাইবাছাই।
প্রার্থিতা প্রত্যাহারের শেষ তারিখ ২০ জানুয়ারি। ২১ জানুয়ারি প্রতীক বরাদ্দ শেষে ২২ জানুয়ারি থেকে প্রচার শুরু করবেন প্রার্থীরা।
বর্তমানে দেশে মোট ভোটার ১২ কোটি ৭৬ লাখ ৯৫ হাজার ১৮৩ জন। যেখানে পুরুষ ভোটার ছয় কোটি ৪৮ লাখ ১৪ হাজার ৯০৭ জন এবং নারী ভোটার ছয় কোটি ২৮ লাখ ৭৯ হাজার।
এবারের ভোটে আরপিও সংশোধনীর কারণে বড় একটি পরিবর্তন আসছে। রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে জোট হলেও ভোট করতে হবে নিজ দলের প্রতীকে।
আর দুইটি ব্যালটে ভোট দিতে হবে। আগেই উল্লেখ করা হয়েছে, একইদিনে সংসদ নির্বাচন ও গণভোট। দুইটি নির্বাচনের জন্য থাকছে দুইটি ব্যালট। এর মধ্যে গণভোটের ব্যালটে থাকছে চারটি প্রশ্ন, তবে উত্তর দিতে হবে একটি, অর্থাৎ, হ্যাঁ বা না তে।
এছাড়া, এবার ভোটের সময়ও বাড়ছে এক ঘণ্টা। মানে সকাল ৮টায় ভোটগ্রহণ শুরু হয়ে শেষ হবে বিকেল ৫টায়। গণভোটও অনুষ্ঠিত হওয়ায় এমন সিদ্ধান্ত নিয়েছে ইসি।
প্রকাশক ও সম্পাদক
মোঃ শাহিন হোসেন
www.dainikabhaynagar.com