ঝিনাইদহ জেলার উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলে অবস্থিত হরিণাকুণ্ডু উপজেলা ইতিহাস, ঐতিহ্য, কৃষি, লোকসংস্কৃতি ও মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিবিজড়িত একটি গুরুত্বপূর্ণ জনপদ। কুমার নদের তীরে গড়ে ওঠা এ অঞ্চল একদিকে যেমন কৃষি উৎপাদনে সমৃদ্ধ, অন্যদিকে তেমনি বিপ্লব, সংস্কৃতি ও শিক্ষার ঐতিহ্যেও উজ্জ্বল।
প্রায় ২২২ দশমিক ৫৪ বর্গকিলোমিটার আয়তনের হরিণাকুণ্ডু উপজেলার উত্তরে কুষ্টিয়া সদর, দক্ষিণে ঝিনাইদহ সদর, পূর্বে শৈলকূপা এবং পশ্চিমে চুয়াডাঙ্গার সদর ও আলমডাঙ্গা উপজেলা অবস্থিত। ১৮৭৯ সালে থানা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত এই অঞ্চল বর্তমানে একটি পৌরসভা, আটটি ইউনিয়ন, ১২২টি গ্রাম ও ৭৪টি মৌজা নিয়ে গঠিত। সর্বশেষ জনশুমারি অনুযায়ী উপজেলার জনসংখ্যা প্রায় ২ লাখ ১৯ হাজার।
হরিণাকুণ্ডু নামের উৎপত্তি নিয়ে রয়েছে নানা লোককথা। স্থানীয়দের মতে, একসময় ঘন অরণ্যে আচ্ছাদিত এ এলাকায় প্রচুর হরিণ বিচরণ করত। বনের মাঝে থাকা একটি বড় জলাশয়ে হরিণের দল পানি পান করতে আসত। ‘হরিণ’ ও ‘কুণ্ড’ শব্দের সমন্বয়ে অঞ্চলটির নাম হয় ‘হরিণাকুণ্ডু’। অন্য একটি মত অনুযায়ী, ব্রিটিশ আমলে নীলকরদের হরিণ শিকারের কেন্দ্র হিসেবেও এ অঞ্চল পরিচিত ছিল।
প্রায় তিনশ বছর আগে এ অঞ্চল ছিল জঙ্গল ও জলাভূমিতে পরিপূর্ণ। কোল, ভিল, সাঁওতাল ও বাগদীসহ বিভিন্ন আদিবাসী ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠী প্রথম এখানে বসতি স্থাপন করেন। তাঁদের কঠোর পরিশ্রমে জঙ্গল পরিষ্কার করে গড়ে ওঠে আজকের জনপদ।
হরিণাকুণ্ডুর ইতিহাসে কুমার নদের গুরুত্ব অপরিসীম। নদীকে কেন্দ্র করেই গড়ে ওঠে জনবসতি ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড। ব্রিটিশ আমলে এ অঞ্চল ছিল নীল চাষের অন্যতম কেন্দ্র। জোড়াদহ, ভবানীপুর ও সোহাগপুর এলাকায় প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল একাধিক নীলকুঠি। আজও এসব নীলকুঠির ধ্বংসাবশেষ ইতিহাসের সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে।
এই জনপদের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে উপমহাদেশের অন্যতম শ্রেষ্ঠ বিপ্লবী বাঘা যতীনের স্মৃতি। তাঁর পৈত্রিক বাড়ি ছিল হরিণাকুণ্ডুর রিশখালী গ্রামে। ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনে তাঁর বীরত্বগাঁথা আজও মানুষের মুখে মুখে উচ্চারিত হয়। স্বাধীনতার জন্য জীবন উৎসর্গকারী এই মহান বিপ্লবী এ অঞ্চলের ইতিহাসকে সমৃদ্ধ করেছে।
১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধেও হরিণাকুণ্ডুর মানুষ সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করে। কাপাসহাটিয়া, জোড়াদহসহ বিভিন্ন এলাকায় মুক্তিযোদ্ধাদের প্রতিরোধ সংগ্রাম পাকিস্তানি বাহিনীকে চাপে ফেলে। মুক্তিযুদ্ধের পাশাপাশি স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনেও হরিণাকুণ্ডুর রাজনৈতিক কর্মী ও সাধারণ মানুষের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল।
শুধু ইতিহাস নয়, সংস্কৃতির ক্ষেত্রেও হরিণাকুণ্ডুর রয়েছে স্বতন্ত্র পরিচয়। লালন দর্শনের প্রভাবে এখানে গড়ে ওঠে বাউল সংস্কৃতির শক্তিশালী ভিত্তি। বিখ্যাত সাধক ও লালন পদকর্তা শুকচাঁদ ফকিরের জন্ম এই জনপদে। তাঁর গান ও দর্শন আজও মানুষের হৃদয়ে বেঁচে আছে।
প্রাকৃতিক সৌন্দর্যেও সমৃদ্ধ হরিণাকুণ্ডু। উপজেলার বিভিন্ন স্থানে ছড়িয়ে রয়েছে অসংখ্য বিল, বাওড় ও জলাশয়। কায়েতপাড়া বাওড়, কাপাসহাটিয়া বাওড়, চাঁদপুর বাওড় ও চারাতলা বাওড় স্থানীয় অর্থনীতি ও জীববৈচিত্র্যে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। কিছু বাওড় ইতোমধ্যে পর্যটন সম্ভাবনার কেন্দ্র হিসেবেও পরিচিতি পাচ্ছে।
কৃষিই হরিণাকুণ্ডুর প্রধান অর্থনৈতিক ভিত্তি। বিশেষ করে এখানকার পানের বরজ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে সুপরিচিত। স্থানীয় চাহিদা মিটিয়ে এই এলাকার পান দেশের বিভিন্ন জেলায় সরবরাহের পাশাপাশি বিদেশেও রপ্তানি হয়। ধান, পাট, গম ও শীতকালীন সবজির উৎপাদনও এ অঞ্চলের অর্থনীতিকে সমৃদ্ধ করেছে।
ইতিহাস, বিপ্লব, মুক্তিযুদ্ধ, লোকসংস্কৃতি, কৃষি ও প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের অপূর্ব সমন্বয়ে গড়ে ওঠা হরিণাকুণ্ডু আজও তার স্বকীয়তা ধরে রেখেছে। কুমার নদের তীরের এই জনপদ অতীতের গৌরবকে ধারণ করে এগিয়ে চলছে উন্নয়ন ও সম্ভাবনার পথে।
প্রকাশক ও সম্পাদক
মোঃ শাহিন হোসেন
www.dainikabhaynagar.com