কোনও রাজনৈতিক পরিচয় নেই, ছিল না কোনও দলীয় রাজনৈতিক সংগঠন কিংবা বছরের পর বছর রাজপথে আন্দোলন আন্দোলনের অভিজ্ঞতা। তা সত্ত্বেও ককরোচ জনতা পার্টি (সিজেপি) এবং সাধারণ শিক্ষার্থী প্রতিবাদকারীরা ভারতের পুরো রাজনৈতিক মহলকে পরাস্ত করতে সক্ষম হয়েছে এবং অবশেষে মোদি সরকারকে নতি স্বীকারে বাধ্য করেছে।
সিজেপি যখন প্রথম জাতীয় রাজনীতিতে আত্মপ্রকাশ করে, তখন একে ভারতীয় রাজনৈতিক দলগুলো সাধারণ এক প্রতিবাদী গোষ্ঠী হিসেবেই দেখেছিল। ভারতীয় রাজনীতিতে যা বহুবার দেখা গেছে, কয়েকজন ক্ষুব্ধ তরুণ, স্লোগান, আর নতি স্বীকার না করার বিষয়ে অনড় একটি সরকার। নাটকের চিত্রনাট্য অত্যন্ত চেনা হলেও, এর পরিণতি হয়েছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন।
কয়েক সপ্তাহ ধরে সিজেপির টানা আন্দোলনের মুখে শনিবার মোদি সরকার শেষ পর্যন্ত নতি স্বীকার করে। শিক্ষার্থীদের মূল দাবিগুলো মেনে নেওয়া হয়, শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধান পদত্যাগ করেন এবং আন্দোলনকারীরা নিজেদের জয় ঘোষণা করে বিক্ষোভ কর্মসূচি প্রত্যাহার করে নেন। নিজেদের সিদ্ধান্তে চরম অনড় থাকার জন্য পরিচিত মোদি সরকারের রাজত্বে এটি অত্যন্ত বিরল ও অভাবনীয় এক অর্জন।
ভারতে বিগত এক দশকে নাগরিকত্ব সংশোধন আইন (সিএএ) বিরোধী আন্দোলন, বছরব্যাপী কৃষক আন্দোলন কিংবা মণিপুরের সহিংসতা নিয়ে এর চেয়েও বড় বিক্ষোভ দেখা গেছে। তবে সেই আন্দোলনগুলোর খুব কমই সরকারের একদম শীর্ষ পর্যায়ে এমন সরাসরি রাজনৈতিক জবাবদিহিতা আদায় করতে পেরেছিল। এমনকি ২০২৪ সালেও নিট পরীক্ষার প্রশ্নফাঁস নিয়ে কয়েক সপ্তাহ ক্ষোভ থাকলেও সরকার কোনও মন্ত্রীকে বলি দেয়নি। তবে এবার কেন হার মানলো মোদি সরকার? পার্থক্যটা শুধু শিক্ষার্থীদের দাবির মধ্যে ছিল না, বরং ছিল তারা যেভাবে লড়াই করেছে তার মধ্যে।
রাজনীতিবিদেরা ভেবেছিলেন অভিজ্ঞতার কাছে তরুণেরা হেরে যাবে। কিন্তু দিনশেষে রাজনীতির নিয়ম কতটা বদলে গেছে, তার এক অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করলো এই আনকোরা তরুণেরাই।
সিজেপির সবচেয়ে বড় সুবিধা ছিল তারা সাধারণ রাজনৈতিক দলের মতো আচরণ করেনি, কারণ তারা সত্যিই কোনও রাজনৈতিক দল ছিল না। আন্দোলনকে রাজনৈতিক বা নির্বাচনি রূপ দেওয়ার চেষ্টা করা হলে সরকার খুব সহজেই তাকে প্রতিপক্ষের রাজনৈতিক খেলা বলে উড়িয়ে দেওয়ার সুযোগ পায়। কিন্তু তরুণেরা সরকারকে সেই চেনা সুযোগ দেয়নি। বিরোধী দলের নেতারা সমর্থনে এগিয়ে এলেও সিজেপি কৌশলে নিশ্চিত করেছে যেন রাজনৈতিক নেতারা কেবল সমর্থক হিসেবেই থাকেন, আন্দোলনের মূল মুখ না হয়ে ওঠেন। ক্যামেরার নজর সবসময় রাজনীবিদদের বদলে শিক্ষার্থীদের ওপরই স্থির ছিল।
রাজনীতিতে আনকোরা হওয়াই সিজেপির সবচেয়ে বড় শক্তিতে পরিণত হয়েছিল। পেশাদার রাজনীতিবিদরা দরকষাকষির সময় ভবিষ্যতের রাজনৈতিক সমীকরণের কথা ভাবেন, কিন্তু শিক্ষার্থীরা তা ভাবেনি। শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত তাদের দাবিগুলো ছিল একদম এক ও অপরিবর্তনীয় জবাবদিহিতা, শিক্ষাব্যবস্থার সংস্কার এবং ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগ। এই স্থিতিশীলতাই তাদের আন্দোলনকে এক অনন্য বিশ্বাসযোগ্যতা এনে দিয়েছিল। কোনও আদর্শিক বিতর্কে না জড়িয়ে আন্দোলনকে শুধু পরীক্ষা, মেধা এবং কোটি কোটি তরুণের ভবিষ্যতের মধ্যেই সীমাবদ্ধ রাখা হয়েছিল, যা সাধারণ অভিভাবক ও শিক্ষকদের গভীরভাবে স্পর্শ করে।
রাজপথের বাইরে সোশ্যাল মিডিয়ার লড়াই
রাজপথ যদি একটি যুদ্ধক্ষেত্র হয়ে থাকে, তবে সোশ্যাল মিডিয়া ছিল অপর যুদ্ধক্ষেত্র। এখানে দুই প্রজন্মের ব্যবধান স্পষ্টভাবে ফুটে ওঠে। আগের আন্দোলনগুলোতে ফেসবুক বা এক্স ব্যবহৃত হতো কেবল হালনাগাদ তথ্য দেওয়ার জন্য। কিন্তু সিজেপির কাছে সোশ্যাল মিডিয়াই ছিল আন্দোলনের মূল ক্ষেত্র।
এখানেই শেষ নয়, শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের জয়ে চাঙ্গা মোদিবিরোধীরা
ইনস্টাগ্রামে পুলিশকে প্রশ্ন করা শিক্ষার্থীর ভিডিও, অনশনের বার্তা, ড্রোন দিয়ে তোলা জনস্রোতের দৃশ্য কিংবা আবেগঘন মুহূর্তগুলো মুহূর্তের মধ্যেই লাখ লাখ মানুষের কাছে পৌঁছে যাচ্ছিলো। মূলধারার টেলিভিশন টকশো শুরুর আগেই অ্যালগরিদম ঠিক করে ফেলছিল মানুষ কী দেখবে।
রাজনৈতিক দলগুলো সোশ্যাল মিডিয়াকে ঐতিহ্যবাহী প্রচারণার ডিজিটাল রূপ হিসেবে দেখলেও, জেন-জি বোঝে অন্য ভাষা। তাদের রাজনৈতিক যোগাযোগ ভিজ্যুয়াল, দ্রুত ও দূরদর্শী। ২০ সেকেন্ডের একটি শক্তিশালী রিল বা একটি রিলেটেবল মিম বিশ মিনিটের সংবাদ সম্মেলনের চেয়ে অনেক বেশি আবেদন তৈরি করেছিল।
সরকার বা বিরোধীদের ডিজিটাল টিম এই গতি সামলাতে হিমশিম খেয়েছে। প্রতিটি শিক্ষার্থীর ফোন ছিল এক একটি সম্প্রচার কেন্দ্র। সরকারের যোগাযোগের যন্ত্র সংসদ বা টকশো সামলাতে পারলেও, সোশ্যাল মিডিয়ায় ছড়িয়ে পড়া হাজার হাজার বিকেন্দ্রীভূত ভিডিও বা রিলকে একক কোনও সংবাদ সম্মেলন দিয়ে ঠেকানো সম্ভব হয়নি।
যন্তর মন্তরের আন্দোলন প্রত্যাহার করলো ককরোচ জনতা পার্টি
বিরোধী দলগুলো সংসদে চাপ সৃষ্টি করলেও তারা আন্দোলন পরিচালনা করছিল না, বরং আন্দোলনকে অনুসরণ করছিল। বছরের পর বছর পর ভারতের রাজনীতিতে তরুণেরা রাজনীতিবিদদের পেছনে না হেঁটে, রাজনীতিবিদদের নিজেদের পেছনে হাঁটাতে বাধ্য করেছে।
অভিজ্ঞ নেতারা যখন বক্তৃতা আর সংবাদ সম্মেলন নিয়ে ব্যস্ত ছিলেন, সিজেপি প্রতিটি প্রতিবাদস্থলকে কনটেন্ট কারখানায় পরিণত করেছিল। রাজনীতিবিদেরা যখন বিষয়টি ধরতে পারলেন, ততক্ষণে তরুণেরা মনোযোগের রাজনীতি এবং একই সঙ্গে মূল রাজনৈতিক লড়াই দুটোতেই জয়ী হয়ে গেছে