কুষ্টিয়ার কুমারখালী উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা কমপ্লেক্স ভবনটি মহান মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি সংরক্ষণ ও বীর মুক্তিযোদ্ধাদের কল্যাণের জন্য নির্মিত হলেও সেখানে বেসরকারি একটি স্কুল ও একটি সংস্থার কার্যক্রম পরিচালনার অভিযোগ উঠেছে। এ নিয়ে স্থানীয়দের মধ্যে প্রশ্ন ও ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, “স্কুল অব নিউক্লিয়াস” নামে একটি বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং “ইচ্ছে” নামে একটি বেসরকারি সংস্থা ভবনের বড় অংশ ব্যবহার করছে। এতে কমপ্লেক্সে শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের নিয়মিত উপস্থিতির কারণে মুক্তিযোদ্ধাদের দাপ্তরিক পরিবেশ ব্যাহত হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, “স্কুল অব নিউক্লিয়াস”-এর সঙ্গে গত বছরের ১৬ জুলাই একটি ভাড়ার চুক্তি হয়। চুক্তি অনুযায়ী, ১ নভেম্বর ২০২৫ থেকে ৩১ অক্টোবর ২০২৮ পর্যন্ত ভবনের নিচতলা এবং দ্বিতীয় তলার পশ্চিম পাশের দুটি কক্ষ মাসিক ১২ হাজার টাকা ভাড়ায় ব্যবহারের অনুমতি দেওয়া হয়।
তবে সরেজমিনে দেখা যায়, নিচতলা থেকে তৃতীয় তলা পর্যন্ত বিভিন্ন কক্ষে স্কুলের কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। শ্রেণিকক্ষ, বেঞ্চ, হোয়াইট বোর্ড, করিডোর ও সিঁড়িতে শিক্ষার্থী-অভিভাবকদের উপস্থিতি লক্ষ্য করা গেছে। দ্বিতীয় তলায় অভিভাবকদের অপেক্ষার স্থান এবং তৃতীয় তলাতেও শ্রেণিকক্ষ হিসেবে ব্যবহারের আলামত পাওয়া গেছে।
চুক্তিপত্র পর্যালোচনায়ও কয়েকটি অসংগতির অভিযোগ উঠেছে। প্রথম পাতায় প্রথম পক্ষ হিসেবে মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডের সভাপতি ও সদস্য-সচিবের নাম থাকলেও শেষ পাতায় উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাকে প্রথম পক্ষ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। এছাড়া স্বাক্ষরের তারিখ ও চুক্তির শেষাংশের তারিখেও অমিল রয়েছে।
চুক্তি অনুযায়ী, কার্যকর হওয়ার আগে তিন মাসের অগ্রিম ভাড়া পরিশোধের কথা থাকলেও তার সুস্পষ্ট প্রমাণ পাওয়া যায়নি বলে অভিযোগ রয়েছে। স্কুল কর্তৃপক্ষ ছয় মাসের ভাড়া পরিশোধের ব্যাংক কাগজপত্র দেখালেও অগ্রিম ভাড়ার তথ্য দেখাতে পারেনি।
এদিকে, “ইচ্ছে” নামে একটি বেসরকারি সংস্থা প্রায় তিন বছর ধরে দ্বিতীয় তলার চারটি কক্ষ ব্যবহার করছে। সংস্থাটি ২০২২ সালের একটি চুক্তিপত্র দেখালেও সেখানে মেয়াদের উল্লেখ নেই। নতুন বা নবায়ন করা কোনো চুক্তিপত্রও দেখাতে পারেনি।
বর্তমানে দায়িত্বপ্রাপ্ত উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ফারজানা আখতার বলেন, দায়িত্ব গ্রহণের পর বিষয়টি তাঁর নজরে আসেনি। অভিযোগ সম্পর্কে অবগত হওয়ার পর তিনি তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস দিয়েছেন।
স্কুল অব নিউক্লিয়াসের প্রতিষ্ঠাতা জীবন হোসেন দাবি করেন, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার মাধ্যমে তারা ভবনটি ভাড়া নিয়েছেন এবং নিয়মিত ব্যাংকে ভাড়া জমা দিচ্ছেন। তবে চুক্তির বাইরে ভবনের অতিরিক্ত অংশ ব্যবহারের বিষয়ে তিনি কোনো ব্যাখ্যা দিতে পারেননি।
মুক্তিযোদ্ধা কমপ্লেক্স অ্যাডহক কমিটির সদস্য-সচিব বীর মুক্তিযোদ্ধা মো. নাসির উদ্দিন এবং অতিরিক্ত দায়িত্বপ্রাপ্ত সমাজসেবা কর্মকর্তা জহুরুল ইসলাম জানান, ভবনের পুরো অংশে স্কুলের কার্যক্রম পরিচালনার বিষয়ে তারা বিস্তারিত অবগত নন।
মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের নীতিমালা অনুযায়ী, মুক্তিযোদ্ধা কমপ্লেক্সের মূল উদ্দেশ্য বীর মুক্তিযোদ্ধাদের দাপ্তরিক কার্যক্রম, স্মৃতি সংরক্ষণ ও কল্যাণ নিশ্চিত করা। নির্ধারিত অংশ ভাড়া দেওয়া গেলেও সেই অর্থ ভবনের রক্ষণাবেক্ষণ ও অসচ্ছল মুক্তিযোদ্ধাদের সহায়তায় ব্যয় করার কথা। এ অবস্থায় ভাড়ার অর্থের ব্যবস্থাপনা ও ভবন ব্যবহারের বিষয়ে নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি জানিয়েছেন স্থানীয় সচেতন নাগরিকরা।
প্রকাশক ও সম্পাদক
মোঃ শাহিন হোসেন
www.dainikabhaynagar.com