
মুক্তিবাহিনী ও ভারতীয় বাহিনী ১৬ ডিসেম্বর সকালে এসে পৌঁছায় মিরপুর ব্রিজে। সেখান থেকেই আত্মসমর্পণের আহ্বান জানিয়ে চিঠি পাঠানো হয় নিয়াজির কাছে। তখন ক্যান্টনমেন্টে চলছিল ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের বৈঠক। সিদ্ধান্ত হয় আত্মসমর্পণের। জেনারেল জামসেদকে দিয়ে পাঠানো হয় জবাব।
পরে আত্মসমর্পণের শর্ত নিয়ে আলোচনার জন্য ক্যান্টনমেন্টে যান ভারতীয় ও মুক্তিবাহিনীর ঊর্ধ্বতনরা। কয়েক ঘণ্টা ধরে চলে আলোচনা। নিয়াজির আশা ছিল, দলিল হবে যুক্তরাষ্ট্রের কনসাল জেনারেলকে দেয়া যুদ্ধবিরতির প্রস্তাবের আদলে।
সাবেক আমলা হাসান জহির তার সেপারেশন অব ইস্ট পাকিস্তান বইয়ে লিখেছেন— পাকিস্তানিরা ‘আত্মসমর্পণ’ শব্দটি এড়াতে আপ্রাণ চেষ্টা করেছিল।
জে এফ আর জ্যাকব তার সারেন্ডার অ্যাট ঢাকা বইয়ে লিখেছেন, আত্মসমর্পণ দলিলের খসড়া লিখেছিলেন তিনিই।
এম এ জি ওসমানী ও এ কে খন্দকারকে অনুষ্ঠানে উপস্থিত করতে অধস্তনদের নির্দেশও দেয়া হয়েছিল। তবে জেনারেল নিয়াজি বাঙালিদের কাছে আত্মসমর্পণে কোনোভাবেই রাজি হননি। এর কারণ ব্যাখ্যা করেছেন শিক্ষাবিদ সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী।
তিনি বলেছেন, পরাজয়টা বাঙালির কাছে হলো, এটা দুইটা কারণে তারা মানতে চায়নি। একটা কারণ হচ্ছে, তাদের ভয় ছিল যে সেটা হলে মানুষ চতুর্দিক থেকে তাদের ঘেরাও করবে এবং তারা ফেরত যেতে পারবে না। দ্বিতীয়ত, তাদের মানসম্মানের ব্যাপার ছিল যে তারা মুক্তিবাহিনীর কাছে হারছে, পূর্ব পাকিস্তানের কাছে হারলো; এটিকে তারা লজ্জাজনক মনে করলো।
দলিল চূড়ান্ত হলে দুই পক্ষের ঊর্ধ্বতনরা সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে যান। ঢাকা ক্লাব থেকে সাক্ষর অনুষ্ঠানের জন্য নেয়া হয় সাদামাটা টেবিল-চেয়ার।
‘ইন্সট্রুমেন্ট অব সারেন্ডার’ নামের দলিলে স্পষ্ট লেখা হয়, পাকিস্তানের সব স্বশস্ত্র বাহিনী বাংলাদেশে ভারতীয় ও বাংলাদেশ বাহিনীর কাছে আত্মসমর্পণ করবে।
এর মধ্যে থাকবে সেনা, নৌ, বিমান বাহিনীসহ সব আধাসামরিক ও বেসামরিক বাহিনী। যেখানেই থাকুক লেফটেন্যান্ট জেনারেল জগজিৎ সিং অরোরার কমান্ডাধীন
নিকটস্থ বাহিনীর কাছে অস্ত্রসমর্পণ করতে হবে সবাইকে। দলিল স্বাক্ষরের সঙ্গে সঙ্গেই আনন্দে ফেটে পড়ে উপস্থিত জনতা।
বীর মুক্তিযোদ্ধা মাহবুব জামান বললেন, ওই অল্প নোটিশে আত্মসমর্পণ করানোটাই দায়িত্ব ছিল। এ কে খন্দকার ছিলেন, আমাদের কমান্ডার অর্থাৎ কর্নেল হায়দার ছিলেন এবং বীরদর্পে হায়দার হেটে যাচ্ছেন সেটা আছে। যখন নেগোসিয়েশন হয়, তখন ওরা বলেছে, উই ক্যান অনলি স্যারেন্ডার টু এ অফিশিয়াল আর্মি। খোলা আকাশের নিচেয় সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে আত্মসমর্পণ করেছে, এটাই গৌরবের।
১৯ ডিসেম্বর ঢাকা ক্যান্টনমেন্টের গলফ মাঠে পাকিস্তানি বাহিনীর সদস্যরা অস্ত্র জমা দিয়ে আনুষ্ঠানিক আত্মসমর্পণ করে।
বিজয়ের আনন্দে সেদিন একসঙ্গে হাসছিল আর কাঁদছিল, সারা ঢাকার মানুষ। হাসি আর কান্নার পেছনে ছিল, অগণিত প্রাণ।
প্রকাশক ও সম্পাদক
মোঃ শাহিন হোসেন
www.dainikabhaynagar.com