
হাফিজুর রহমান কালীগঞ্জ (সাতক্ষীরা) প্রতিনিধি
সাতক্ষীরার কালীগঞ্জ উপজেলায় ভূমি অফিসে চরম অনিয়ম ও ঘুষ বাণিজ্যের অভিযোগ উঠেছে। উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) স্পষ্ট নির্দেশ দেওয়ার পরও এক অন্ধ ও প্যারালাইজড ব্যক্তির কাছ থেকে নেওয়া ঘুষের টাকা ফেরত দেয়নি নায়েব তহশিলদার রেজাউল ইসলাম—এমন গুরুতর অভিযোগ পাওয়া গেছে।
ভুক্তভোগী রমেশ চন্দ্র বিশ্বাস (মন্ডল) কালীগঞ্জ উপজেলার রতনপুর ইউনিয়নের কাশীশ্বরপুর গ্রামের মৃত কৃষ্ণপদ বিশ্বাসের পুত্র। তিনি শারীরিকভাবে অন্ধ ও প্যারালাইজড। অভিযোগে জানা যায়, রতনপুর বাজারে সরকারি খাস (পেরি) জমির ওপর তার ৬ ফুট বাই ৯ ফুট আকারের একটি দোকানের ডিসিআর (ডিমান্ড কেস রেজিস্টার) কাটতে রতনপুর ইউনিয়ন ভূমি অফিসে গেলে তৎকালীন তহশিলদার রেজাউল ইসলাম তার কাছ থেকে ২৫ হাজার টাকা ঘুষ গ্রহণ করেন।
পরবর্তীতে দোকানের সংস্কারের নামে আরও ২০ হাজার টাকা দাবি করা হয়। অতিরিক্ত টাকা দিতে অস্বীকৃতি জানালে ডিসিআর দেওয়া হবে না এবং দোকানে শাটার বসাতে বাধা দেওয়া হবে বলে হুমকি দেওয়া হয়। একপর্যায়ে রমেশ বিশ্বাস গুরুতর অসুস্থ হয়ে ভারতে চিকিৎসা নিতে যান। তিন মাস চিকিৎসা শেষে দেশে ফিরে আসেন অন্ধ ও প্যারালাইজড অবস্থায়।
এদিকে নিজের নামে থাকা ৩৪ শতক জমির নামজারি ও খাজনা দাখিলা কাটতে গেলে নায়েব তহশিলদার রেজাউল ইসলাম আরও ১২ হাজার টাকা ঘুষ দাবি করেন। টাকা দিতে অস্বীকৃতি জানালে তার কাগজপত্র ছিঁড়ে ফেলে অফিস থেকে বের করে দেওয়া হয়। পরে অফিসের পিয়নের মাধ্যমে ৯ হাজার টাকা দেওয়ার পর মাত্র ৪ হাজার ৪৩ টাকার দাখিলার রশিদ প্রদান করা হয়।
ঘটনায় প্রতিকার না পেয়ে ভুক্তভোগী রমেশ বিশ্বাস ও তার স্ত্রী রত্নাশীল সদ্য বদলি হওয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা অনুজা মণ্ডলের কাছে লিখিত অভিযোগ করেন। অভিযোগের পর বিষয়টি বর্তমান উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) মইনুল ইসলাম খানের কাছে পাঠানো হয়।
ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, এসিল্যান্ড মইনুল ইসলাম খান ঘুষ গ্রহণের সত্যতা পাওয়ার পর নায়েব তহশিলদার রেজাউল ইসলামকে এক সপ্তাহের মধ্যে ২৫ হাজার টাকা ফেরত দেওয়ার নির্দেশ দেন। কিন্তু একই সঙ্গে তিনি ভুক্তভোগী দম্পতির সঙ্গে চরম দুর্ব্যবহার করেন এবং অফিস থেকে বের করে দেন। নির্ধারিত তারিখ ১৪ ডিসেম্বরেও ঘুষের টাকা ফেরত দেওয়া হয়নি।
পরবর্তীতে উপজেলা ভূমি অফিসের নাজির দেবব্রত ফোন করে অফিসে ডেকে নিলেও টাকা ফেরত না দিয়ে সাংবাদিকদের কাছে অভিযোগ করায় ক্ষিপ্ত হয়ে ভুক্তভোগীদের তহশিলদারের সঙ্গে যোগাযোগ করতে বলেন এবং অফিস থেকে তাড়িয়ে দেন বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে।
সরেজমিন অনুসন্ধানে জানা গেছে, কালীগঞ্জ উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়ন ভূমি অফিস দীর্ঘদিন ধরে দুর্নীতির আখড়ায় পরিণত হয়েছে। অভিযোগ রয়েছে—তহশিলদার, নাজির, সার্ভেয়ার ও অফিস সহায়করা মিলেমিশে ঘুষ বাণিজ্য চালাচ্ছে। ঘুষ না দিলে সাধারণ সেবাগ্রহীতাদের নানাভাবে হয়রানি করা হচ্ছে।
এ বিষয়ে অভিযুক্ত তহশিলদার রেজাউল ইসলামের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি প্রথমে ঘুষ নেওয়ার অভিযোগ অস্বীকার করেন। পরে বলেন, “আমি টাকা ফেরত দেব বলেছি, বিষয়টি সাংবাদিকদের জানানো কেন?”
উপজেলা ভূমি অফিসের নাজির দেবব্রত অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, টাকা ফেরতের বিষয়ে তহশিলদারের সঙ্গে কথা বলতে হবে। অন্যদিকে উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) মইনুল ইসলাম খান দুর্ব্যবহারের বিষয়টি স্বীকার করে বলেন, নায়েবের বিরুদ্ধে ঘুষের একাধিক অভিযোগ তিনি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানিয়েছেন।
বর্তমানে অন্ধ ও প্যারালাইজড রমেশ বিশ্বাস তার স্ত্রীকে সঙ্গে নিয়ে ডিসিআর না পাওয়া এবং ঘুষের টাকা ফেরতের দাবিতে এক অফিস থেকে আরেক অফিসে ঘুরে বেড়াচ্ছেন। ভুক্তভোগী পরিবার জেলা প্রশাসকের জরুরি হস্তক্ষেপ কামনা করেছে।
প্রকাশক ও সম্পাদক
মোঃ শাহিন হোসেন
www.dainikabhaynagar.com