
লেখক: মোঃ রমজান আলী
বাংলাদেশের গণতন্ত্র সময়ের চাহিদা অনুযায়ী ক্রমশ পরিণত ও বিকশিত হচ্ছে। উন্নত বিশ্বের সাথে তাল মিলিয়ে নির্বাচন ব্যবস্থাকে আরো অংশগ্রহণমূলক, আধুনিক ও নাগরিক-বান্ধব করতে নানা উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। সেই উদ্যোগগুলোর মধ্যে সবচেয়ে আলোচিত ও প্রবাসী বাংলাদেশিদের জন্য প্রত্যাশিত একটি পদক্ষেপ হলো ‘Postal Vote BD’ অ্যাপ চালু। গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ, ১৯৭২ এর অনুচ্ছেদ ২৭ অনুসারে বাংলাদেশ নির্বাচন কমিশন আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন-২০২৬ এ বিদেশে অবস্থানরত বাংলাদেশী, সরকারি কর্মচারী, ভোট কার্যক্রমে নিয়োজিত ব্যক্তিবর্গ ও আইনি হেফাজতে থাকা ভোটারদের পোস্টাল ব্যালটের মাধ্যমে ভোটদানের জন্য নির্বাচন কমিশন সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছে। এ লক্ষ্যে কমিশন ভোট প্রদানের জন্য বিদ্যমান ব্যবস্থাকে প্রযুক্তিনির্ভর, আধুনিক ও সময়োপযোগী করতে Postal Vote BD নামে একটি মোবাইল অ্যাপ প্রস্তুত করেছে। যার মাধ্যমে বিদেশে অবস্থানরত বাংলাদেশী ভোটারগণ অনলাইনে আবেদন করে ভোট প্রদানের জন্য নিবন্ধন করতে পারবেন। বিদেশে অবস্থানরত আবেদনকারী ভোটারগণের তথ্যাদি যাচাইপূর্বক বাংলাদেশ ডাক বিভাগের মাধ্যমে তাদের বিদেশের ঠিকানায় পোস্টাল ব্যালট প্রেরণ করা হবে। প্রতীক বরাদ্দ হলে ভোটারগণ অ্যাপের মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট আসনের প্রার্থী তালিকা সম্পর্কে অবগত হওয়ার পর প্রাপ্ত পোস্টাল ব্যালটে ভোট প্রদান এবং ফিরতি খামে সংশ্লিষ্ট রিটার্নিং অফিসার বরাবর ডাকযোগে প্রেরণ করবেন। নিবন্ধিত ভোটার ব্যালট পেপার প্রেরণের অগ্রগতি অ্যাপের মাধ্যমে পর্যবেক্ষণ করতে পারবেন। ২৫ ডিসেম্বর, ২০২৫ পযন্ত প্রবাসী বাংলাদেশী ভোটারগণ Postal Vote BD অ্যাপের মাধ্যমে নিবন্ধন করতে পারবেন।
ভোটদানের নিবন্ধন প্রক্রিয়ায় প্রবাসী ভোটারকে যে দেশ থেকে ভোট দিতে ইচ্ছুক কেবল সেই দেশের মোবাইল নম্বর এবং জাতীয় পরিচয়পত্রের মূল বা প্রিন্ট কপি, পাসপোর্টের কপি, প্রবাসে অবস্থানরত দেশের নির্ভুল ও পূর্ণ ঠিকানা (যেখানে পোস্টাল ব্যালট পাঠানো হবে) দিতে হবে। পোস্টাল ব্যালট প্রাপ্তি এবং ভোট প্রদানের জন্য Google Play Store অথবা App Store হতে ‘Postal Vote BD’ মোবাইল অ্যাপ ডাউনলোড ও ইনস্টল করতে হবে। ব্যবহারকারী বাংলা বা ইংরেজি যেকোন একটি ভাষা নির্বাচন করে অ্যাপে নিবন্ধন করতে হবে। ওটিপি, চেহারার মিল ও জাতীয় পরিচয়পত্র যাচাইপূর্বক আবেদন প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা হবে। অ্যাপটি ব্যবহার করা সহজ ও দ্রুত, মাত্র ১০ মিনিটেই আপনি একাউন্ট তৈরি করতে পারবেন। একটি মোবাইল ডিভাইসে একজন নিবন্ধন করতে পারবেন। আপনার দেওয়া তথ্য পৃথকভাবে যাচাই করা হবে। অসম্পূর্ণ বা ভুল তথ্য প্রদানকারীর ভোট বাতিল হবে। সাইবার নিরাপত্তার জন্য শক্তিশালী ও জটিল পাসওয়ার্ড ব্যবহার করুন। কখনোই আপনার পাসওয়ার্ড অথবা ওটিপি কারো সাথে শেয়ার করবেন না। নিজের নিবন্ধন ও ভোটিং প্রক্রিয়া নিজেই সম্পাদন করুন। সোশ্যাল মিডিয়া অ্যাকাউন্টের প্রাইভেসি সেটিংস আপডেট রাখুন। ইমেইল, SMS বা QR কোডে থাকা অপরিচিত লিংকে ক্লিক করা থেকে বিরত থাকুন। সন্দেহজনক ই-মেইল বা SMS ক্লিক না করে ডিলিট করুন। কেবলমাত্র অফিসিয়াল App Store বা Play Store থেকে যেকোনো অ্যাপ ডাউনলোড করুন।
Postal Vote BD মোবাইল অ্যাপে নিবন্ধিত সকল ভোটারের নিকট পর্যায়ক্রমে ব্যালট পেপার প্রেরণ করা হবে। নিবন্ধন থেকে শুরু করে ব্যালট পাওয়া, ভোট দেওয়া এবং ফেরত পাঠানো, সবমিলিয়ে পুরো প্রক্রিয়াটি হবে পাঁচধাপে। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে নিবন্ধিত ভোটারগণ প্রদত্ত ঠিকানায় নির্বাচন কমিশন কর্তৃক প্রেরিত পোস্টাল ব্যালটসহ খাম পাবেন। খাম প্রাপ্তির পরপরই ভোটারগণ Postal Vote BD মোবাইল অ্যাপ এ লগইন করে খামের উপর প্রদত্ত QR কোডটি স্ক্যান করবেন। এতে আপনি যে ব্যালট পেপারটি হাতে পেয়েছেন তা সিস্টেমে সনাক্ত হবে। ভোটারগণ নির্বাচন কমিশন হতে প্রাপ্ত বহির্গামী খামে (ফরম-১) একটি পোস্টাল ব্যালট সম্বলিত খামের (ফরম-১০ক) মধ্যে পোস্টাল ব্যালট পেপার (ফরম-৭), একপাশে ভোট প্রদানের নির্দেশাবলী (ফরম-১১) ও অপর পাশে একটি ঘোষণাপত্র (ফরম-৮) সম্বলিত একটি পৃথক কাগজ এবং একটি ফেরত খাম (ফরম-১০) পাবেন যেখানে সংশ্লিষ্ট আসনের রিটার্নিং অফিসারের ঠিকানা মুদ্রিত থাকবে। পোস্টাল ভোটিং প্রক্রিয়ায় প্রেরিত ব্যালট পেপারে সকল প্রতীক মুদ্রিত থাকবে যার প্রতিটি প্রতীকের পাশে ফাকা ঘর রয়েছে। ভোটাধিকার প্রয়োগের পূর্বে ভোটারগণ নির্দেশনাপত্র পড়ে ঘোষণাপত্রে যথাযথভাবে ব্যালট পেপারের ক্রমিক নং, ভোটারের নাম, জাতীয় পরিচয়পত্র নম্বর উল্লেখ করে প্রদত্ত স্থানে স্বাক্ষর করবেন। নিরক্ষর ব্যক্তি অন্য একজন বৈধ ভোটারের সাহায্যে ফরম-৮ এর সংশ্লিষ্ট অংশ পূরণ ও সত্যয়ন করে স্বাক্ষর করবেন। এ ঘোষণাপত্র বা সত্যয়নপত্র (প্রযোজ্য ক্ষেত্রে) ছাড়া ব্যালট পেপারটি বৈধ হিসাবে গন্য হবে না।
প্রতীক বরাদ্দ সম্পন্ন হলে অ্যাপের মাধ্যমে অথবা নির্বাচন কমিশনের ওয়েব সাইট হতে ভোটারগণ অবগত হবেন। ভোট প্রদানের জন্য ভোটারগণ Postal Vote BD মোবাইল অ্যাপে লগইন করে সংশ্লিষ্ট আসনের প্রার্থীদের তালিকা দেখতে পাবেন এবং নির্দেশিকাতে প্রদত্ত পদ্ধতিতে ব্যালট পেপারে (ফরম-৭) মুদ্রিত প্রতীকের পাশে ফাঁকা ঘরে টিক (√) চিহ্ন কিংবা ক্রস (x) চিহ্ন প্রদান করবেন। Postal Vote BD মোবাইল অ্যাপে ভোটদান পদ্ধতির ভিডিও টিউটোরিয়াল বা ডিজিটাল কন্টেন্ট আছে। পোস্টাল ব্যালট পেপারে ভোটার ভোট চিহ্নিত করবার পর শুধু ব্যালট পেপারটি ছোট খামে (ফরম-১০ক) রেখে খামটি বন্ধ করবেন, অতঃপর উক্ত ব্যালট পেপার সম্বলিত খামটি এবং স্বাক্ষরিত ঘোষণপত্রটি রিটার্নিং অফিসারের ঠিকানা মুদ্রিত খামে (ফরম-১০) ভরে তা বন্ধ করে ডাকযোগে দ্রুত প্রেরণের ব্যবস্থা গ্রহণ করবেন। উভয় খামের উপরিভাগের টেপটি খুলে নিলেই খাম বন্ধ হবে। এছাড়া, খামটি পাঠানোর জন্য কোন ডাক মাশুল প্রদান করতে হবেনা। এটি বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক পরিশোধিত থাকবে। নির্বাচন কমিশন হতে কেন্দ্রীয়ভাবে পোস্টাল ব্যালট ভোটারের নিকট প্রেরণের পর হতে রিটার্নিং কর্মকর্তার নিকট ফেরত আসা পর্যন্ত সমগ্র প্রক্রিয়াটির বিভিন্ন পর্যায়ে ব্যালটের অবস্থান মোবাইল অ্যাপের মাধ্যমে পর্যবেক্ষণ করা যাবে। ভোটারগণ স্ব স্ব মোবাইল হতে Postal Vote BD মোবাইল অ্যাপ ব্যবহার করে নিজ ব্যালটের অবস্থান পর্যবেক্ষণ করতে পারবেন। কিন্তু নির্বাচনের অন্তত ১৭ দিন আগে পোস্টাল ভোট পাঠিয়ে দিতে না পারলে নির্বাচনের পরে ভোটটি পৌঁছালে সেটি আর গ্রহণযোগ্য হবে না।
প্রবাসীদের জন্য দেশে না ফিরেও বিদেশে ঘরে বসেই ভোটের সুযোগ, মোবাইল অ্যাপের মাধ্যমে সহজ নিবন্ধন, ডাকযোগে ব্যালট পাওয়া ও ফেরত পাঠানো, এনআইডি ও সেলফি যাচাইয়ের মাধ্যমে নিরাপদ অথেন্টিকেশন, প্রার্থিতা চূড়ান্ত হওয়ার পর অ্যাপে সব প্রার্থীর নাম দেখে ভোট দেওয়ার সুযোগ, বিশ্বের যেকোনো দেশে বসেই নিজের এলাকার নির্বাচনে অংশগ্রহণ করা। ইসি জানায়, অ্যাপটি পুরোপুরি আইটি-সাপোর্টেড হলেও ভোট প্রদানের অংশটি থাকবে ম্যানুয়েল, যাতে কোনো সাইবার ঝুঁকি ভোটকে প্রশ্নবিদ্ধ করতে না পারে। যদিও বিশ্বব্যাপী এই ধরনের সিস্টেমে পাঁচ বছর ট্রায়াল চলে, বাংলাদেশ খুব সীমিত সময়েই পরিক্ষা করে সিস্টেমটি চালু করছে, তবে ভোটে অনিয়ম ঠেকাতে সর্বোচ্চ নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হয়েছে। অ্যাপসটির সুবিধাসমূহ হলো-মোবাইল নম্বর দিয়ে সুরক্ষিত প্রোফাইল তৈরি। ই-কেওয়াইসি (eKYC) প্রক্রিয়ায় পরিচয় যাচাই। ফেস ভেরিফিকেশন (মুখমণ্ডল যাচাই) ও লাইভনেস ডিটেকশন। পাসপোর্ট ও পোস্টাল ঠিকানা প্রদান। নিবন্ধিত হওয়ার পর ব্যালট পেপার ডাকযোগে পাঠানোর প্রক্রিয়া ট্র্যাক ও ডেলিভারি স্ট্যাটাস জানা যাবে। ব্যালট হাতে পাওয়ার পর অ্যাপে QR কোড স্ক্যান ও লাইভনেস চেক সম্পন্ন করা যাবে। কাগজে কলমে ম্যানুয়ালি ভোট দেওয়া ও ব্যালট পেপারের খামটি অ্যাপের মাধ্যমে চিহ্নিত করে ডাকযোগে ফেরত পাঠানো। বাংলা ও ইংরেজি উভয় ভাষায় ব্যবহারযোগ্য। গুরুত্বপূর্ণ আপডেট ও ডেডলাইনের জন্য অ্যালার্ট। সম্পূর্ণ প্রক্রিয়াটি নিরাপদ ও যাচাইকৃত। প্রবাসীদের জন্য পোস্টেজ ও কুরিয়ার চার্জবিহীন।
আপনি বাংলাদেশি, আপনি এ দেশের গণতন্ত্রের অংশ। এককোটি ৩০ লাখ প্রবাসী এতদিন ভোটাধিকার থেকে বঞ্চিত ছিলেন, এ উদ্যোগ তাদের সেই বঞ্চনা দূর করবে। এটি শুধু একটি অ্যাপ নয়, বাংলাদেশের গণতন্ত্রকে আরো প্রতিনিধিত্বশীল করার একটি নতুন অধ্যায়। এ উদ্যোগটির সবচেয়ে পরিষ্কার বার্তাটি হলো, রাষ্ট্র নাগরিকের অধিকারকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে বদ্ধপরিকর। বিদেশে নাগরিক অধিকার ও সুযোগ সবার জন্য সমান। প্রতিটি নাগরিকের মতামত সহজে ও নিরাপদে প্রকাশ করতে পারাই গণতন্ত্রের পূর্ণতা। প্রবাসী বাংলাদেশিরা এতদিন সেই সুযোগ থেকে বঞ্চিত ছিলেন। Postal Vote BD অ্যাপ চালুর মাধ্যমে সরকার শুধু একটি প্রযুক্তিগত সেবা চালু করেনি, বরং এক বিশাল জনগোষ্ঠীকে দেশের ভবিষ্যৎ গঠনের প্রক্রিয়ায় যুক্ত করেছে। এ উদ্যোগ গণতন্ত্রকে আরো শক্তিশালী, অন্তর্ভুক্তিমূলক ও আধুনিক করার পথে এক ঐতিহাসিক অগ্রগতি। প্রবাসীদের জন্য তথা পুরো জাতির জন্যও একটি গুরুত্বপূর্ণ অর্জন। গণতন্ত্রের এই যাত্রায় Postal Vote BD এক নতুন দিগন্ত।
পিআইডি ফিচার।
লেখক: মোঃ রমজান আলী সহকারী তথ্য অফিসার, আঞ্চলিক তথ্য অফিস, খুলনা
প্রকাশক ও সম্পাদক
মোঃ শাহিন হোসেন
www.dainikabhaynagar.com