সংস্কার, গণ-আন্দোলন, সহিংসতা, অর্থনৈতিক শঙ্কা ও নির্বাচনের অপেক্ষায় কেটে গেল বছর
জুলাইয়ের গণ-অভ্যুত্থানের রক্তপাত ও আত্মত্যাগের মধ্য দিয়ে জন্ম নেওয়া নতুন বাংলাদেশকে ঘিরে মানুষের ছিল ব্যাপক প্রত্যাশা। সেই প্রত্যাশা পূরণ হয়েছে কতটা—বছরের শেষ দিনে এসে প্রশ্নটা আজও জোরালো। মানবাধিকার, ন্যায়বিচার, বাকস্বাধীনতা ও নিরাপত্তার প্রশ্নগুলো এখনো মানুষের হৃদয়ে উদ্বেগ তৈরি করছে। রাষ্ট্রীয় বাহিনীর নির্বিচার দমনপীড়ন কমলেও উচ্ছৃঙ্খল জনতার হাতে মানবাধিকার লঙ্ঘনের নতুন বাস্তবতা সামনে এসেছে। অর্থনীতি, কর্মসংস্থান, আয়বৈষম্য ও জীবনযাত্রার ব্যয়—সব মিলিয়ে বছরটি ছিল চাপ ও অনিশ্চয়তায় ভরা।
অর্থনীতি ও জীবিকার বাস্তবতা
২০২৫ সালে বিনিয়োগে ধীরগতি, কর্মসংস্থানের সংকট ও ক্রয়ক্ষমতা হ্রাস মানুষের জীবনে অনিশ্চয়তা বাড়িয়েছে। ব্যবসা-বাণিজ্যে গতি কমেছে, বিনিয়োগপ্রবণতা কমেছে, জনজীবনে বেড়েছে উদ্বেগ। সরকার যুক্তি দিয়েছে—গণ-অভ্যুত্থানের পর বহু দেশে এমন পরিস্থিতি দেখা যায়, বাংলাদেশ তুলনামূলক ভালো আছে। তবু নাগরিক প্রত্যাশা পূরণের ক্ষেত্রে ঘাটতি স্পষ্ট।
বছরজুড়ে বড় রাজনৈতিক ও জাতীয় ঘটনা
জুলাই অভ্যুত্থানের পর দায়িত্ব পাওয়া অন্তর্বর্তী সরকার ২০২৫ সালটিকে পায় পূর্ণ প্রশাসনিক সময় হিসেবে। বছরের শুরুতেই কর–ভ্যাট নীতিতে বড় পরিবর্তন আসে। বছরজুড়ে আন্দোলন, বিক্ষোভ, দাবিদাওয়া ও সহিংসতা দেখা যায়।
বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার চিকিৎসা, পরে দেশে ফেরা এবং বছরের শেষে তাঁর মৃত্যু রাজনীতিতে বড় মোড় ঘুরিয়েছে।
এনসিপির আত্মপ্রকাশ, জুলাই সনদ প্রণয়ন, বিচারিক প্রক্রিয়ার অগ্রগতি, আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধ ঘোষণা, বড় বড় দুর্ঘটনা, সন্ত্রাসী হামলা—সব মিলিয়ে বছরটি হয়ে ওঠে নাটকীয় ও উত্তাল।
ওসমান হাদি হত্যা ও আতঙ্কের রাজনীতি
ডিসেম্বরের শুরুতে ইনকিলাব মঞ্চের আহ্বায়ক শরিফ ওসমান হাদির হত্যাকাণ্ড রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন উত্তাপ সৃষ্টি করে। এই হত্যাকে কেন্দ্র করে উত্তেজনা, বিক্ষোভ, প্রতিবাদ ও বিচার দাবির আন্দোলন আজও চলছে।
মিডিয়ায় হামলা ও স্বাধীনতার প্রশ্ন
১৮ ডিসেম্বর সংগঠিত পরিকল্পিত হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত হয় দেশের শীর্ষ সংবাদমাধ্যম প্রথম আলো ও দ্য ডেইলি স্টারের কার্যালয়সহ কয়েকটি সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান। এতে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা নিয়ে নতুন উদ্বেগ তৈরি হয়।
নির্বাচনের অপেক্ষা: সমাধানের আশা
১২ ফেব্রুয়ারির ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে ঘিরেই এখন সব আশা–আকাঙ্ক্ষা। বিশ্লেষকদের মতে, রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি, অর্থনীতি—সবকিছু স্বাভাবিক করতে শক্তিশালী নির্বাচিত সরকারের খুব প্রয়োজন। মানুষ আজও আশায়—নির্বাচনের পর কি সত্যিকারের গণতন্ত্র, মানবাধিকার ও ন্যায়বিচার নিশ্চিত হবে?
সমাপ্তি
দীর্ঘ সংগ্রামের পর নতুন বাংলাদেশের স্বপ্ন এখনো পূর্ণতা পায়নি। ২০২৫ শেষ হলো অনিশ্চয়তা, ক্ষোভ, সহিংসতা, হতাশা ও একই সঙ্গে আশার এক ভারসাম্যে। এখন দৃষ্টি ২০২৬ এবং সামনে থাকা নির্বাচনের দিকে—দেশ কি নতুন পথে হাঁটবে, নাকি অনিশ্চয়তার এই যাত্রা আরও দীর্ঘ হবে—এখন সেই অপেক্ষা।
প্রকাশক ও সম্পাদক
মোঃ শাহিন হোসেন
www.dainikabhaynagar.com