
নতুন শিক্ষাবর্ষ শুরুর প্রায় এক মাস পেরিয়ে গেলেও এখনো শিক্ষার্থীদের হাতে পৌঁছায়নি ৩০ লাখের বেশি পাঠ্যবই। পহেলা জানুয়ারি বই উৎসবের পর ১৫ জানুয়ারির মধ্যে শতভাগ বই বিতরণের যে লক্ষ্য জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড (এনসিটিবি) নির্ধারণ করেছিল, ২৫ জানুয়ারি পার হলেও তা পূরণ হয়নি। সবচেয়ে বেশি সংকট দেখা দিয়েছে মাধ্যমিক স্তরে, বিশেষ করে ষষ্ঠ থেকে অষ্টম শ্রেণিতে।
এনসিটিবি সূত্রে জানা গেছে, প্রাথমিক ও প্রাক-প্রাথমিক স্তরে বই বিতরণ সম্পূর্ণ হলেও মাধ্যমিক স্তরে এখনো উল্লেখযোগ্য সংখ্যক বই ছাপা ও সরবরাহ বাকি রয়েছে। এ অবস্থায় সময়মতো বই বিতরণে ব্যর্থতার দায় কার, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। যদিও এনসিটিবির দাবি, চলতি মাসের মধ্যেই শতভাগ বই শিক্ষার্থীদের হাতে পৌঁছাবে।
এবার প্রাথমিক ও মাধ্যমিক মিলিয়ে মোট ৩০ কোটি ২৩ লাখ ৬৫ হাজার ৬৫৩ কপি পাঠ্যবই ছাপার পরিকল্পনা ছিল। এর মধ্যে মুদ্রণ সম্পন্ন হয়েছে ২৯ কোটি ৯১ লাখ ১৮ হাজার ৩৫৪ কপি, যা ৯৯ দশমিক ৭৮ শতাংশ। তবে ২৪ জানুয়ারি রাত পর্যন্ত উপজেলা পর্যায়ে পৌঁছেছে ২৯ কোটি ৭১ লাখ ৮০ হাজার ৮৫৯ কপি। ফলে এখনো বিতরণ বাকি রয়েছে ৩০ লাখ ৫৮ হাজার ৭৯৪ কপি বই, যা মোট নির্ধারিত বইয়ের প্রায় ১ দশমিক ২ শতাংশ।
স্বস্তির দিক হলো, প্রাক-প্রাথমিক ও প্রাথমিক (সাধারণ) স্তরে বই বিতরণ শতভাগ সম্পন্ন হয়েছে। প্রাক-প্রাথমিক স্তরে নির্ধারিত ৮ কোটি ৫৯ লাখ ২৫ হাজার ৩৭৯ কপি বইয়ের মুদ্রণ, পিডিআই ও ডেলিভারি পুরোপুরি শেষ হয়েছে। একইভাবে প্রাথমিক স্তরের ৩১ কোটি ১০ লাখের বেশি বই শিক্ষার্থীদের হাতে পৌঁছেছে।
সংকট মূলত কেন্দ্রীভূত হয়েছে মাধ্যমিক স্তরে। ষষ্ঠ থেকে নবম শ্রেণি পর্যন্ত মোট নির্ধারিত বই ছিল ১৮ কোটি ৩২ লাখের বেশি। এর মধ্যে মুদ্রণ প্রায় সম্পন্ন হলেও বিতরণ নেমে এসেছে ৯৮ দশমিক ৩৩ শতাংশে। ফলে এই স্তরেই আটকে রয়েছে পুরো ৩০ লাখের বেশি বই।
শ্রেণিভিত্তিক হিসাবে দেখা গেছে, সপ্তম শ্রেণিতে পরিস্থিতি সবচেয়ে খারাপ। এই শ্রেণিতে এখনো ১০ লাখ ৭৬ হাজারের বেশি বই বিতরণ হয়নি, যা মোটের ২ দশমিক ৫৩ শতাংশ। ষষ্ঠ, অষ্টম ও নবম শ্রেণিতে ঘাটতির হার তুলনামূলক কম হলেও লক্ষাধিক শিক্ষার্থী বই ছাড়া রয়েছে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, চলতি শিক্ষাবর্ষে পাঠ্যবই ছাপার কাজ রিটেন্ডারের মধ্যে পড়ায় দরপত্র প্রক্রিয়া পুনরায় শুরু করতে হয়। এতে প্রেস নির্বাচন, কাগজ সংগ্রহ, মুদ্রণ সূচি ও সরবরাহ ব্যবস্থায় বিলম্ব ঘটে। এর সরাসরি প্রভাব পড়ে বই বিতরণ কার্যক্রমে। এ ছাড়া নির্দিষ্ট কিছু প্রেসকে সুবিধা দিতে দরপত্রে অনিয়ম ও সিন্ডিকেটের অভিযোগও উঠেছে। এসব অভিযোগের পর ষষ্ঠ থেকে অষ্টম শ্রেণির পাঠ্যবই ছাপার ৬০৩ কোটি টাকার দরপত্র বাতিল করা হয়, যা পুরো প্রক্রিয়াকে আরও ধীর করে দেয়।
এনসিটিবির বিতরণ নিয়ন্ত্রক মোহাম্মদ মতিউর রহমান খান পাঠান বলেন, মুদ্রণ প্রক্রিয়ায় ‘শর্ট বই’ একটি স্বাভাবিক বিষয়। কাগজ কাটা বা ছাপার সময় ত্রুটির কারণে কিছু সংখ্যক বই কম-বেশি হয়। সব মিলিয়ে এই ঘাটতির কারণেই নির্ধারিত সময়ের মধ্যে শতভাগ বই বিতরণ সম্ভব হয়নি। তিনি আশা প্রকাশ করেন, আগামী ২৮ জানুয়ারির মধ্যেই অবশিষ্ট বই বিতরণ সম্পন্ন হবে।
এনসিটিবির চেয়ারম্যান (অতিরিক্ত দায়িত্ব) মো. মাহবুবুল হক পাটওয়ারী বলেন, আগের বছরের তুলনায় এবার পরিস্থিতি কিছুটা উন্নত। তবে ভবিষ্যতে পহেলা জানুয়ারির মধ্যেই শতভাগ বই বিতরণ নিশ্চিত করতে হলে আরও বাস্তবসম্মত পরিকল্পনা, আগাম প্রস্তুতি এবং সময়ভিত্তিক কার্যক্রম নির্ধারণ জরুরি। সঠিক সমন্বয় থাকলে নির্ধারিত সময়েই শিক্ষার্থীদের হাতে বই পৌঁছে দেওয়া সম্ভব।