বাংলার কৃষিতে যান্ত্রিকীকরণের জয়গান যখন চারদিকে, তখন কুড়িগ্রামের রৌমারী সীমান্তে দেখা যাচ্ছে এক ভিন্নতর ও করুণ চিত্র। বিদ্যুতের লোডশেডিং আর জ্বালানি তেলের তীব্র সংকটে এখানকার কৃষি ব্যবস্থা যেন কয়েক দশক পিছিয়ে গেছে। পানির অভাবে মাঠের ধান যখন শুকিয়ে চৌচির, তখন জীবন বাঁচাতে কৃষকরা আবারও ফিরে যাচ্ছেন আদিম ‘ঢেঁকি কলে’।রৌমারীর শৌলমারী ও দাঁতভাঙ্গা ইউনিয়নের গ্রামগুলোতে এখন ফসলের চেয়ে হাহাকার বেশি। ১০ কাঠা জমিতে বোরো আবাদ করেছেন কৃষক খোকন মিয়া। চারা বড় হওয়ার এই সময়ে যখন প্রচুর পানির প্রয়োজন, তখনই শুরু হয়েছে বিদ্যুৎ ও তেলের সংকট। খোকন মিয়া আক্ষেপ করে বলেন:
“পাশের একজনের মোটরে পানি নিতাম, কারেন্ট নাই তাই তাও বন্ধ। পরে ডিজেল চালিত মেশিনের ভরসায় নতুন করে আইল কাটলাম, কিন্তু বাজারে তেলই নাই। শেষমেশ বাধ্য হয়ে জমিতে ‘ঢেঁকি কল’ পুঁতেছি। আমি কাজে গেলে আমার স্ত্রী সখিনা এখন এই কলে পানি সেচে।” এই চিত্র কেবল খোকন মিয়ার নয়; এটি রৌমারীর কয়েক হাজার প্রান্তিক কৃষকের বর্তমান জীবন সংগ্রামের প্রতিচ্ছবি। জ্বালানি তেল: সোনার হরিণ- তেলের পাম্পগুলোতে দীর্ঘ লাইন, তবুও মিলছে না কাঙ্ক্ষিত ডিজেল। দাঁতভাঙ্গার কৃষক আফসার আলী দুই দিন লাইনে দাঁড়িয়েও তেল না পেয়ে ফিরে এসেছেন। তিনি আক্ষেপ করে জানান, বাইরে থেকে অনেক বেশি দামে তেল কিনে কোনোমতে চাষাবাদ টিকিয়ে রাখার চেষ্টা করছেন। কিন্তু এই অতিরিক্ত খরচ আর শারীরিক পরিশ্রমের পর ফসল ঘরে তোলা সম্ভব হবে কি না, তা নিয়ে তিনি শঙ্কিত। আফসার আলীর কন্ঠে ঝরে পড়ল গভীর অনিশ্চয়তা—”আল্লাহই জানে এবার আমার কপালে কী লেখা আছে।”
কৃষি ও অর্থনীতির ওপর প্রভাব- রৌমারীর এই সংকট শুধু একজন কৃষকের ব্যক্তিগত সমস্যা নয়, বরং এটি জাতীয় খাদ্য নিরাপত্তার ওপর একটি বড় সতর্কবার্তা।
সংকটের কারণ প্রভাব বর্তমান সমাধান (বিকল্প) বিদ্যুৎ বিভ্রাট বৈদ্যুতিক সেচ পাম্প অকেজো ডিজেল চালিত মেশিন
ডিজেল সংকট যান্ত্রিক সেচ ব্যাহত প্রাচীন ঢেঁকি কল ও হস্তচালিত পদ্ধতি উচ্চমূল্য উৎপাদন খরচ বৃদ্ধি মানবেতর পরিশ্রম ও পারিবারিক শ্রম
সরকারের প্রতি আকুতি
কৃষকদের দাবি অত্যন্ত সাধারণ এবং মৌলিক—তারা কোনো অনুদান চাচ্ছেন না, কেবল নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করার অনুরোধ জানাচ্ছেন। খোকন মিয়ার ভাষায়, “সরকারের কাছে একটাই অনুরোধ, আমগো তেলটা যেন সরবরাহ করে। চাষ না করলে আমরা খামু কী?” অপ্রতিরোধ্য অগ্রযাত্রার গল্পগুলো ম্লান হয়ে যায় যখন একজন কৃষককে তার জমিতে পানির জন্য ২০২৬ সালেও আদিম ঢেকিকল ব্যবহার করতে হয়। স্থানীয় কৃষি বিভাগ ও প্রশাসনের দ্রুত হস্তক্ষেপই পারে রৌমারীর এই দিগন্তজোড়া ফসলের মাঠকে নিশ্চিত মৃত্যুর হাত থেকে বাঁচাতে। নচেৎ, কৃষকের এই ঘাম আর চোখের পানি কেবল ধুলোতেই মিশবে, গোলায় আর ধান উঠবে না।