
কুষ্টিয়ার প্রশাসনিক ইতিহাসে অনেক জেলা প্রশাসক এসেছেন এবং গেছেন। কেউ শুধু ফাইলের স্তূপ রেখে গেছেন, কেউবা দাপ্তরিক স্মৃতি। কিন্তু মাত্র সাড়ে তিন মাসের সংক্ষিপ্ত সময়ে একজন মানুষ কিভাবে জেলার সাধারণ মানুষের ‘মনের রাজা’ হয়ে উঠতে পারেন, তার জীবন্ত উদাহরণ হয়ে রইলেন মো. ইকবাল হোসেন।
১ মার্চ, জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের এক প্রজ্ঞাপনে তার প্রত্যাহারের খবর কুষ্টিয়ায় পৌঁছালে শহরজুড়ে নেমে আসে বিষাদের ছায়া।
সাধারণের মাঝে অসাধারণ
গত বছরের ৯ নভেম্বর রাজউক থেকে কুষ্টিয়ায় পদার্পণ করতেই তিনি চেয়ারে বসে দপ্তরের দরজা খুলে দিয়েছিলেন সাধারণ মানুষের জন্য। কোনো প্রটোকল বা দীর্ঘ অপেক্ষার বালাই ছিল না; রিকশাচালক থেকে নিঃস্ব বিধবা—সবাই সরাসরি তার কাছে দুঃখের কথা বলতে পারতেন।
কেন তিনি হৃদয়ে জায়গা করে নিলেন? কুষ্টিয়ার মানুষের মুখে মুখে আজ তার মানবিকতার গল্প:
রাতের আঁধারে আর্তমানবতার সেবা: শীতের রাতে কম্বল হাতে ছিন্নমূল মানুষের পাশে দাঁড়ানো, অসুস্থ রোগীর চিকিৎসার ব্যয়ভার ব্যক্তিগতভাবে বহন—এসবই তাকে ‘ডিসি’ থেকে ‘জনতার অভিভাবক’ হিসেবে পরিচিত করিয়েছে।
দুর্নীতির বিরুদ্ধে আপসহীন: সরকারি অফিসে ঘুষ ও দালালের দৌরাত্ম্য বন্ধে ছিলেন বজ্রকঠোর।
ছাত্র-জনতার সেতুবন্ধন: তরুণ প্রজন্মের আকাঙ্ক্ষা বোঝা এবং তাদের সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে কাজ করার মানসিকতা তাকে সবার প্রিয় করে তুলেছিল।
“আমরা একজন সরকারি আমলাকে দেখিনি, আমরা একজন বড় ভাইকে হারিয়েছি। কুষ্টিয়া যখন মাত্র স্থিতিশীল হচ্ছিল, তখন তার চলে যাওয়া আমাদের জন্য বড় ক্ষতি।”
— একজন স্থানীয় শিক্ষার্থী
তার প্রত্যাহারের খবরে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলোতে বইছে প্রতিবাদের ঝড়। কুষ্টিয়ার সাধারণ মানুষ ও ছাত্র-জনতা এই সিদ্ধান্ত মেনে নিতে পারছেন না। জেলা প্রশাসনের কার্যালয় প্রাঙ্গণে বিকেলে অনেকেই চোখ মুছতে দেখা গেছে।
মো. ইকবাল হোসেন হয়তো কাল বা পরশু কুষ্টিয়া ছেড়ে চলে যাবেন, কিন্তু তিনি রেখে যাচ্ছেন এক গভীর শূন্যতা এবং একটি বড় শিক্ষা—ক্ষমতা নয়, ভালোবাসাই মানুষকে অমর করে রাখে। কুষ্টিয়ার মানুষ তাকে মনে রাখবে একজন ‘জনবান্ধব প্রশাসক’ নয়, বরং হৃদয়বান এক মানুষ হিসেবে।