ঝিনাইদহের কোটচাঁদপুরে প্রেমের ফাঁদে ফেলে এক দাখিল পরীক্ষার্থীকে (১৭) ধর্ষণ এবং আপত্তিকর ভিডিও ধারণ করে ব্ল্যাকমেইলের অভিযোগে সৌরভ কুমার নিতাই (২২) নামের এক যুবককে গ্রেফতার করেছে পুলিশ। এই ঘটনায় এলাকায় ব্যাপক চাঞ্চল্য ও ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। ভুক্তভোগী পরিবারের আহাজারিতে ভারী হয়ে উঠেছে জগন্নাথপুর গ্রামের আকাশ-বাতাস।
প্রেমের আড়ালে সুক্ষ্ম জাল মামলার এজাহার ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, উপজেলার জগন্নাথপুর গ্রামের জিয়ারুল ইসলামের মেয়ে বনি খাতুন (১৭) এ বছর দাখিল পরীক্ষায় অংশ নিচ্ছিল। অভিযুক্ত সৌরভ কুমার নিতাই পেশায় একজন ডেকোরেটর মিস্ত্রি। সে সুকৌশলে বনির মোবাইল নম্বর সংগ্রহ করে দীর্ঘ আট মাস ধরে প্রেমের অভিনয় চালিয়ে আসছিল। সরল বিশ্বাসে বনি তার সাথে প্রেমের সম্পর্কে জড়িয়ে পড়লে, গত জানুয়ারি মাসে বিয়ের প্রলোভন দেখিয়ে তাকে বিভিন্ন স্থানে নিয়ে শারীরিক সম্পর্ক স্থাপন করে সৌরভ। পৈশাচিক লালসা চরিতার্থ করার পাশাপাশি সে গোপনে সেই দৃশ্য মোবাইলে ধারণ করে রাখে।
পরবর্তীতে সেই গোপন ভিডিও ইন্টারনেটে ছড়িয়ে দেওয়ার ভয় দেখিয়ে বনিকে জিম্মি করে ফেলে সৌরভ। গত ২৫ মার্চ ২০২৬ তারিখ রাত আনুমানিক ১১টার দিকে ছাত্রীর নিজ বাড়ির পেছনের একটি মেহগনি বাগানে ডেকে নিয়ে যায় সে। ভিডিও ফাঁসের হুমকিতে আতঙ্কিত হয়ে বনি সেখানে গেলে সৌরভ তাকে পুনরায় জোরপূর্বক ধর্ষণ করে। লোকলজ্জা আর ভিডিও প্রকাশের ভয়ে এতদিন মুখ না খুললেও বিষয়টি পরিবারের নজরে এলে গত সোমবার (০৪ মে) কোটচাঁদপুর থানায় মামলা দায়ের করা হয়।
ঘটনার আকস্মিকতায় এবং মেয়ের ভবিষ্যতের চিন্তায় ভেঙে পড়েছেন ভুক্তভোগীর বাবা-মা। মামলার বাদী ও মা চামেলী খাতুন অশ্রুসিক্ত কণ্ঠে বলেন:
”আমরা গরিব মানুষ, অনেক কষ্ট করে মেয়েটাকে পড়াচ্ছি যেন সে নিজের পায়ে দাঁড়াতে পারে। কিন্তু ওই নরপশু সৌরভ আমার মেয়ের জীবনটা তছনছ করে দিয়েছে। সে শুধু আমার মেয়েকে ধর্ষণই করেনি, নগ্ন ভিডিও করে দিনের পর দিন ব্ল্যাকমেইল করেছে। আমি সমাজের কাছে এবং আইনের কাছে এই লম্পটের এমন কঠিন শাস্তি চাই যেন আর কোনো মা-বাবার বুক এভাবে খালি না হয়।”
মেয়ের বাবা জিয়ারুল ইসলাম ক্ষোভ উগরে দিয়ে বলেন:
”আমার মেয়েটা লজ্জায় আর আতঙ্কে মানুষের সামনে মুখ দেখাতে পারছে না। ইন্টারনেটে ভিডিও ছাড়ার ভয় দেখিয়ে ওকে যে নরক যন্ত্রণা দেওয়া হয়েছে, তার কোনো ক্ষমা নেই। আমি চাই আদালত এমন দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দিক যাতে এই এলাকায় ইভটিজিং বা ধর্ষণের মতো অপরাধ করার সাহস কেউ না পায়।”
কোটচাঁদপুর থানা পুলিশ সূত্রে জানা গেছে,অভিযোগ পাওয়ার পরপরই বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে খতিয়ে দেখে তাৎক্ষণিক অভিযান চালানো হয়। পুলিশ দ্রুততম সময়ে অভিযুক্ত সৌরভ কুমার নিতাইকে আটক করতে সক্ষম হয়।
মামলা নম্বর: ০৫, তারিখ: ০৪/০৫/২০২৬ খ্রি.
আইনি ধারা: নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন (সংশোধনী ২০০৩)-এর ৯(১) এবং পর্নোগ্রাফি নিয়ন্ত্রণ আইন ২০১২-এর ৮ ধারা।
আসামির কাছ থেকে অপরাধে ব্যবহৃত মোবাইল ফোনটি উদ্ধারের প্রক্রিয়া চলছে যা মামলার গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণ হিসেবে বিবেচিত হবে।
পুলিশ জানিয়েছে,ভিকটিমকে ডাক্তারি পরীক্ষার জন্য হাসপা’ তালে পাঠানো হবে। তবে বর্তমানে মেয়েটির দাখিল পরীক্ষা চলমান থাকায় তার শিক্ষাজীবনের কথা বিবেচনা করে আগামীকাল তাকে ডিএনএ টেস্ট ও অন্যান্য পরীক্ষার জন্য ঝিনাইদহ সদর হাসপাতালে নেওয়া হবে।
কোটচাঁদপুর থানার পক্ষ থেকে স্পষ্ট জানানো হয়েছে, এ বিষয়ে কোনো প্রকার আপস বা শিথিলতা প্রদর্শন করা হবে না। দোষীর সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিত করতে এবং জনমনে স্বস্তি ফেরাতে পুলিশ সর্বোচ্চ পেশাদারিত্বের সাথে কাজ করছে। এলাকাবাসী এই ন্যাক্কারজনক ঘটনার দ্রুত বিচার ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবিতে সোচ্চার রয়েছেন।