
মোঃ মাসুম বিল্লাল, স্টাফ রিপোর্টার
দেশব্যাপী শিক্ষাঙ্গনে শৃঙ্খলা ফেরাতে বর্তমান সরকার বিভিন্ন দিকনির্দেশনামূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে। ২৪ শে গণঅভ্যুত্থানের পর থেকে বিভাগ, জেলা ও মফস্বল পর্যায়ে সরকারি বিভিন্ন দপ্তরে পূর্বতন ক্ষমতাসীন দলের প্রভাবশালীদের অনিয়মের বিরুদ্ধে পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে। সে ধারাবাহিকতায় যশোরের মণিরামপুর উপজেলার গোপালপুর স্কুল অ্যান্ড কলেজের প্রধান শিক্ষক মোঃ রেজাউল করিমের বিরুদ্ধেও একাধিক অভিযোগ উঠেছে।
তথ্য অনুসন্ধানে জানা যায়, অধ্যক্ষ রেজাউল করিম শিক্ষকতার পাশাপাশি পূর্ববর্তী সরকারের সময় বিভিন্ন প্রভাবশালী গোষ্ঠীর ঘনিষ্ঠতা ব্যবহার করে ব্যক্তিগত স্বার্থ হাসিলে সক্রিয় ছিলেন। নিয়োগ বাণিজ্য, স্বজনপ্রীতি, অদক্ষ শিক্ষক নিয়োগ, রাজনৈতিক আনুগত্য প্রদর্শন এবং প্রতিষ্ঠানের অভ্যন্তরে শিক্ষক সিন্ডিকেট গঠনসহ নানা অভিযোগ উঠে এসেছে তার বিরুদ্ধে।
প্রাপ্ত তথ্যে দেখা যায়, ১৯৯২ সালে সহকারী শিক্ষক হিসেবে গোপালপুর স্কুল অ্যান্ড কলেজে যোগ দেন রেজাউল করিম। ২০০৮ সালে সাবেক প্রতিমন্ত্রী স্বপন ভট্টাচার্যের স্ত্রী ও তৎকালীন সভাপতি তন্দ্রা ভট্টাচার্যের আস্থাভাজন হয়ে তিনি অধ্যক্ষের দায়িত্বে নিয়োগ পান। এরপর থেকেই প্রতিষ্ঠান-কেন্দ্রিক বিভিন্ন সিদ্ধান্ত ও কর্মকাণ্ডে একচ্ছত্র প্রভাব বিস্তার করেন তিনি। রাজনৈতিক ও দলীয় কর্মসূচিতেও নিয়মিত অংশগ্রহণ করতে দেখা গেছে তাকে।
২০১২ সালে প্রতিষ্ঠানটি এমপিওভুক্ত হওয়ার পর অধ্যক্ষ রেজাউল করিম শিক্ষক নিয়োগে সরাসরি ভূমিকা নেন। প্রতিষ্ঠানের ক্রীড়া শিক্ষক মোঃ আসাদুজ্জামান—যিনি লিখতে-পড়তে অদক্ষ হলেও—তার ঘনিষ্ঠতার মাধ্যমে নিয়োগ পান বলে অভিযোগ রয়েছে। এমনকি বিতর্কিত জার্সি ইস্যুতে অভিযুক্ত হওয়া সত্ত্বেও তিনি বহাল তবিয়তে চাকরি করে যাচ্ছেন।
চলতি বছরের জুলাই মাসে অধ্যক্ষ রেজাউল করিম ৮ মাসের ঐচ্ছিক ছুটির আবেদন করেন। তবে এডহক সভাপতি মাত্র দুই মাসের ছুটি অনুমোদন করেন। সেই দুই মাসের ছুটি সেপ্টেম্বরেই শেষ হলেও তিনি এখনো প্রতিষ্ঠানে যোগ দেননি। তার অনুপস্থিতিতে ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন পলাশ ঘোষ।
এদিকে, গণমাধ্যমে অনুসন্ধানের খবর ছড়িয়ে পড়ায় রেজাউল করিম আতঙ্কিত হয়ে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কাছে অতিরিক্ত ছুটির আবেদন করেন বলে জানা গেছে। কিন্তু রাজনৈতিক ও সামাজিক মহলের নজরে আসায় তা নাকচ হয়ে যায়। স্থানীয় প্রশাসনের এক সাবেক কর্মকর্তা বিষয়টির সত্যতা নিশ্চিত করেছেন।
অনুসন্ধান আরও বলছে, পলাতক অবস্থায় থাকা অধ্যক্ষ রেজাউল করিমকে রক্ষা করতে শিক্ষক সিন্ডিকেটের কয়েকজন সদস্য বহিরাগত বিভিন্ন মহলকে ‘ম্যানেজ’ করার চেষ্টা করছেন। অন্যদিকে নিয়োগ বাণিজ্যের মাধ্যমে প্রতারিত ভুক্তভোগীরা ন্যায়বিচারের আশায় মাঝে মাঝে তার গ্রামের খালি পড়ে থাকা আলিশান বাড়ির সামনে ভিড় করেন।
বহুবার যোগাযোগের চেষ্টা করেও এই প্রতিবেদক অধ্যক্ষ রেজাউল করিমের বক্তব্য নিতে ব্যর্থ হন। তবে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মোঃ সম্রাট হোসেন জানান, তার অনুমোদনের জন্য পাঠানো ছুটির কপিটি পর্যালোচনা করা হচ্ছে এবং বিষয়টি খতিয়ে দেখা হবে।
যদিও জানা গেছে যে অধ্যক্ষ রেজাউল করিম নিজের প্রাপ্য অনুযায়ী ৮ মাসের ঐচ্ছিক ছুটির যোগ্য, তবে কর্তৃপক্ষের নির্দেশ অমান্য এবং অনুমোদনবিহীন অতিরিক্ত ছুটি নেওয়ায় প্রতিষ্ঠানে ব্যাপক সমালোচনার সৃষ্টি হয়েছে।
এই দুই পর্বের অনুসন্ধানী প্রতিবেদনের প্রথম পর্ব হিসেবে আজকের তথ্য প্রকাশ করা হলো। পরবর্তী পর্বে বাকি অভিযোগগুলোর বিশদ অনুসন্ধানের সত্যতা তুলে ধরা হবে।
অনুসন্ধান চলমান।