
হযরত শাহজালাল বিমানবন্দরে আবারও সক্রিয় হয়ে উঠেছে কথিত ‘বডি কন্ট্রাক্ট’ সিন্ডিকেট। মালয়েশিয়াগামী বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের একটি ফ্লাইটকে কেন্দ্র করে এমন আশঙ্কা জোরালো হয়েছে। জাল বা টেম্পার্ড ভিসার অভিযোগে কয়েকজন যাত্রীকে আটকে দেওয়ার পর একই গ্রুপের আরও ৬১ জন যাত্রী বোর্ডিং না করেই বিমানবন্দর ত্যাগ করেন বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।
শনিবার (৪ জুলাই) রাত ৮টা ৩৫ মিনিটে ঢাকা থেকে মালয়েশিয়ার উদ্দেশে ছেড়ে যাওয়া বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের বিজি-৩৮৬ ফ্লাইটে এ ঘটনা ঘটে।
বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের মহাব্যবস্থাপক (জিএম) বুশরা ইসলাম , জানান২৬২টি আসনের বিপরীতে ফ্লাইটটিতে ২৫৪ জন যাত্রী বুকিং করেছিলেন। বোর্ডিং গেটে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের প্যাসেঞ্জার কন্ট্রোল ইউনিট (বিজি পিসিইউ) টেম্পার্ড ভিসার অভিযোগে পাঁচ যাত্রীকে অফলোড করে। এ ছাড়া ইমিগ্রেশন কর্তৃপক্ষ আরও ১০ জনকে অফলোড করে।
তিনি আরও বলেন, ‘বোর্ডিং গেটে ৬১ জন যাত্রী উপস্থিত না হওয়ায় (নো-শো) শেষ পর্যন্ত ১৯২ জন প্রাপ্তবয়স্ক ও একজন শিশুসহ মোট ১৯৩ জন যাত্রী নিয়ে ফ্লাইটটি ঢাকা ত্যাগ করে।’
বিমানবন্দর ও গোয়েন্দা সূত্র জানায়, গোপন তথ্যের ভিত্তিতে আগেই ধারণা করা হয়েছিল, ওই রাতে ‘বডি কন্ট্রাক্ট’-এর মাধ্যমে একটি বড় দল মালয়েশিয়া যাওয়ার চেষ্টা করবে। এ জন্য সংশ্লিষ্ট ফ্লাইটের যাত্রীদের ওপর বিশেষ নজরদারি চালানো হয়। বোর্ডিং গেটে পুনরায় পাসপোর্ট ও ভিসা যাচাইয়ের সময় পাঁচজনের কাগজপত্রে অসঙ্গতি ধরা পড়লে তাদের অফলোড করা হয়।
এরপর বিষয়টি একই গ্রুপের অন্যদের মধ্যে ছড়িয়ে পড়লে ৬১ জন যাত্রী আর বোর্ডিং করেননি। তারা বিমানবন্দর ত্যাগ করেন বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি।
প্রাথমিক তদন্তে জানা গেছে, এসব যাত্রী পর্যটন (ট্যুরিস্ট) ভিসায় মালয়েশিয়া যাচ্ছিলেন। তবে একটি ট্রাভেল এজেন্সির মাধ্যমে সেখানে গিয়ে অবৈধভাবে অবস্থানের পরিকল্পনা ছিল বলে সন্দেহ করছেন তদন্ত-সংশ্লিষ্টরা। গোয়েন্দাদের ধারণা, এটি মানবপাচারের একটি সম্ভাব্য কৌশল হতে পারে।
ঘটনার পর নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে, ভিসায় অসংগতি থাকার পরও কীভাবে সংশ্লিষ্ট যাত্রীরা চেক-ইন ও ইমিগ্রেশনের একাধিক ধাপ অতিক্রম করে বোর্ডিং গেট পর্যন্ত পৌঁছালেন?
সংশ্লিষ্ট সূত্রের ভাষ্য, চেক-ইন পর্যায়ে প্রয়োজনীয় যাচাই ছাড়াই ভিসা গ্রহণ করা হয় এবং পরে ইমিগ্রেশন থেকেও বিদেশযাত্রার অনুমতি পান তারা। তবে বোর্ডিং গেটে পুনরায় যাচাইয়ের সময় পাঁচজনের ভিসা টেম্পার্ড বা জাল বলে শনাক্ত হয়।
গোয়েন্দা সূত্রের দাবি, ‘বডি কন্ট্রাক্ট’ নামে পরিচিত একটি সংঘবদ্ধ চক্র অর্থের বিনিময়ে জাল বা ত্রুটিপূর্ণ কাগজপত্র ব্যবহারকারী ব্যক্তিদের বিদেশে পাঠানোর চেষ্টা করে। এ কাজে বিমানবন্দরের কিছু অসাধু কর্মকর্তা-কর্মচারী ও বাইরের দালালদের সম্পৃক্ততার অভিযোগও রয়েছে। সম্প্রতি কয়েকটি গোয়েন্দা তদন্তে এমন সম্পৃক্ততার প্রমাণও মিলেছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের নির্বাহী পরিচালক গ্রুপ ক্যাপ্টেন এস এম রাগীব সামাদ বলেন, ‘বিষয়টি ইমিগ্রেশন পুলিশ এবং সংশ্লিষ্ট বিমান কর্তৃপক্ষ বলতে পারবে।’
অন্যদিকে ইমিগ্রেশন পুলিশের দায়িত্বশীল কর্মকর্তার সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তার কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের জিএম বুশরা ইসলাম বলেন, ‘৬১ জন যাত্রী নো-শো হয়েছেন। এখানে আমাদের এয়ারলাইন্সের কেউ ধরা পড়েননি যে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেব। যারা আসেননি, তারাও একই গ্রুপের হতে পারেন।’
তিনি আরও বলেন, ‘আমরা এয়ারলাইন্স পরিচালনা করি, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী নই। বোর্ডিং পাস নেওয়ার পরও কোনো যাত্রী বিমানে না উঠলে তাকে খুঁজে আনার দায়িত্ব আমাদের নয়। টিকিট কেটে ভ্রমণ না করলে আর্থিক ক্ষতি যাত্রীরই।’
এদিকে ডিএমপির বিমানবন্দর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) কামরুল হাসান তালুকদার বলেন, ‘জাল ভিসা বা পাসপোর্ট সংক্রান্ত বিষয়ে বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষ কিংবা ইমিগ্রেশন পুলিশের পক্ষ থেকে আমাদের কাছে কোনো অভিযোগ বা মামলা করা হয়নি।’
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, ঘটনার সঙ্গে জড়িত ব্যক্তি, ট্রাভেল এজেন্সি কিংবা সম্ভাব্য মানবপাচার সিন্ডিকেট শনাক্তে গোয়েন্দা সংস্থাগুলো কাজ করছে। একই সঙ্গে কীভাবে সন্দেহভাজন যাত্রীরা নিরাপত্তার একাধিক স্তর অতিক্রম করলেন, সেটিও তদন্তের আওতায় রয়েছে বলে সূত্র জানায়।