
তৌহিদুর রহমান, কাশিয়ানী (গোপালগঞ্জ) প্রতিনিধি
গোপালগঞ্জের কাশিয়ানী উপজেলায় সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোর জমি দখল এখন ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসের তথ্য অনুযায়ী, উপজেলার ১৭১টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মধ্যে অন্তত ২৫টির নিজস্ব জমির একটি বড় অংশ দীর্ঘদিন ধরে অবৈধ দখলে রয়েছে। বেদখল হওয়া জমির পরিমাণ প্রায় ৩ একর ৫৬.৭০০ শতাংশ, যেখানে গড়ে উঠেছে বাজার, বসতঘর, মসজিদ, মাদ্রাসা, ঈদগাহ, কবরস্থান, পুকুর, দোকানঘর, গোয়ালঘর ও এমনকি বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানও।
উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিস সূত্র জানায়, ১৭১টি বিদ্যালয়ের মধ্যে ১১টির কোনো নিজস্ব জমিই নেই। তারা সরকারি খাস জমির ওপর অবস্থিত। অপরদিকে যেসব বিদ্যালয়ের জমি রয়েছে, তার একটি বড় অংশ স্থানীয় প্রভাবশালী ব্যক্তি ও জমিদাতাদের উত্তরসূরীদের দখলে চলে গেছে। অনেক ক্ষেত্রে দখল টিকিয়ে রাখতে মামলা দায়ের করা হয়েছে, আবার কোথাও রাজনৈতিক ও সামাজিক প্রভাব খাটানো হচ্ছে।
কালবেলার অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, জমি হারিয়ে অনেক বিদ্যালয় অন্য স্থানে কোনোভাবে পরিচালিত হলেও ভবন বরাদ্দ পাওয়া সত্ত্বেও নির্মাণ করা সম্ভব হয়নি। ফলে শিক্ষক থাকলেও শিক্ষার্থী সংখ্যা কমছে, পাঠদানে মারাত্মক বিঘ্ন ঘটছে। কোথাও মাঠ নেই, কোথাও শ্রেণিকক্ষের পাশেই টয়লেটের দুর্গন্ধ, আবার কোথাও মিল বা দোকানের শব্দে পাঠদান অসম্ভব হয়ে পড়েছে। বর্ষা মৌসুমে কোনো কোনো বিদ্যালয়ে যেতে হয় নৌকা, ভেলা কিংবা অস্থায়ী সাঁকো দিয়ে।
দখলের চিত্র: মাঠহীন স্কুল, ঝুঁকিপূর্ণ পরিবেশ
১৪৮ নম্বর চন্দ্রদ্বীপ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ৩৩ শতাংশ জমির মধ্যে ২৩ শতাংশই দখল হয়ে গেছে। মাত্র ১০ শতাংশ জমির ওপর একটি ভবন দাঁড়িয়ে আছে। বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মনিরা খানম বলেন, “বারবার অনুরোধ ও লিখিত আবেদন করেও জমি উদ্ধার সম্ভব হয়নি। অথচ পুরো জমির খাজনা আমরা পরিশোধ করছি।”
৩৮ নম্বর পশ্চিম রাতইল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ৮৭ শতাংশ জমির মধ্যে ২১ শতাংশ বেদখল। সেখানে পাশের মাদ্রাসার টিনসেড ঘর ও টয়লেট নির্মাণ করা হয়েছে। ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক মো. কামরুজ্জামান জানান, টয়লেটের দুর্গন্ধে শ্রেণিকক্ষে পাঠদান প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়েছে।
পিংগলিয়া ২৯ নম্বর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ৩১ শতাংশ জমির মধ্যে ২৫ শতাংশই বেদখলে। প্রধান শিক্ষক আঞ্জুমান আরা জানান, পাশের মাদ্রাসা কর্তৃপক্ষ স্কুলের জমি মিউটেশন করে নিয়েছে। জমি উদ্ধারে মামলা চলমান থাকায় প্রাচীর নির্মাণ করা যাচ্ছে না।
উপজেলার প্রাণকেন্দ্রে অবস্থিত ২৭ নম্বর কাশিয়ানী মডেল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ৩৫ শতাংশ জমির মধ্যে ১০ শতাংশ বেদখল। সেখানে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের একটি পরিত্যক্ত জরাজীর্ণ ভবন রয়েছে। প্রধান শিক্ষক কামরুল ইসলাম বলেন, “৪২০ জন শিক্ষার্থী থাকলেও খেলাধুলার জায়গা নেই। ভবনের ভেতরে সাপ-বিচ্ছুর আতঙ্ক থাকে।”
৪০ নম্বর তিতাগ্রাম শিবপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের জমির একটি অংশে দোকানঘর ও পুকুর তৈরি হয়েছে। ১০২ নম্বর পশ্চিম দেবাসুর বিদ্যালয়ের জমিও জমিদাতার দখলে থাকায় শিক্ষার্থীরা মাঠবিহীন অবস্থায় পড়াশোনা করছে।
মসজিদ-মাদ্রাসা, বাজার, বসতঘর—সবই স্কুলের জমিতে
অনুসন্ধানে আরও জানা যায়, আড়ুয়াকান্দি, খাগড়াবাড়ীয়া, পূর্বপুইশুর, শিতারামপুর, ঘোনাপাড়া, কড়িগ্রাম, সাজাইল, পদ্মবিলা, রাইতকান্দি, বাগঝাপা, ছোট পারুলিয়া, ভাদুলিয়া, বিশ্বনাথপুর, বালিয়াডাঙ্গা, সাফলীডাঙ্গা, রাজপাট, সিল্টা ও চাপ্তা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের জমিতে মসজিদ, মাদ্রাসা, কবরস্থান, দোকানঘর, বসতবাড়ি, মিল ও রাস্তা নির্মাণ করা হয়েছে। কোথাও মামলা চলমান, কোথাও দীর্ঘদিন ধরে প্রশাসনিক নিষ্ক্রিয়তা বিরাজ করছে।
প্রশাসনের বক্তব্য
কাশিয়ানী উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা (টিইও) উত্তম কুমার সরকার বলেন, “সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের কিছু জমি বেদখল হয়ে আছে। বিষয়টি জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার ও উপজেলা নির্বাহী অফিসারকে জানানো হচ্ছে। ইতোমধ্যে কিছু মামলা করা হয়েছে এবং যত দ্রুত সম্ভব জমিগুলো উদ্ধারের চেষ্টা চলছে।”
জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা জ্যোৎস্না খাতুন বলেন, “উপজেলা প্রশাসনের সহযোগিতায় বেদখল জমিগুলো চিহ্নিত করে উদ্ধার করতে আমরা পদক্ষেপ নিচ্ছি।”
প্রশ্ন থেকেই যায়
সরকারি সম্পত্তি হওয়া সত্ত্বেও বছরের পর বছর বিদ্যালয়ের জমি দখল হয়ে থাকা, মামলা ঝুলে থাকা এবং প্রশাসনিক কার্যকর উদ্যোগের অভাব—সব মিলিয়ে প্রশ্ন উঠেছে, কাশিয়ানীর প্রাথমিক শিক্ষার পরিবেশ কি আদৌ নিরাপদ? মাঠহীন, ঝুঁকিপূর্ণ ও অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে বেড়ে ওঠা শিশুদের ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বিগ্ন অভিভাবক ও সচেতন মহল দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপের দাবি জানিয়েছেন।