বাল্যবিবাহ ও যৌতুক প্রতিরোধে সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধি এবং মেয়েদের শিক্ষার মানোন্নয়নের লক্ষ্যে খুলনার কয়রা উপজেলায় সুন্দরবন মাধ্যমিক বালিকা বিদ্যালয়ে এক সচেতনতামূলক সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে।
সোমবার (১৩ জানুয়ারি) বিদ্যালয়ের আয়োজনে বিদ্যালয়ের হলরুমে এ সভা অনুষ্ঠিত হয়।
বিদ্যালয়ের সহকারী প্রধান শিক্ষক রনজিৎ কুমার বাইনের সভাপতিত্বে এবং শিক্ষক দেবদাস মন্ডলের সঞ্চালনায় আয়োজিত সভায় প্রধান অতিথি হিসেবে বক্তব্য রাখেন কয়রা থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) জাহিদুল ইসলাম জাহাঙ্গীর।
সভায় শিক্ষক-শিক্ষার্থী, সাংবাদিক ও অভিভাবকবৃন্দ উপস্থিত ছিলেন।
প্রধান অতিথির বক্তব্যে ওসি জাহিদুল ইসলাম জাহাঙ্গীর বলেন, খুলনা জেলা পুলিশ সুপারের দিকনির্দেশনায় কয়রা উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় বাল্যবিবাহ, যৌতুক, মাদক ও সামাজিক অপরাধ প্রতিরোধে ধারাবাহিকভাবে সচেতনতামূলক মতবিনিময় সভা করা হচ্ছে।
তিনি বলেন,“বাল্যবিবাহ সমাজের জন্য একটি ভয়াবহ অভিশাপ। এটি মেয়েদের শারীরিক, মানসিক, সামাজিক ও শিক্ষাগত বিকাশকে মারাত্মকভাবে বাধাগ্রস্ত করে। বাল্যবিবাহ শুধু নারীর মৌলিক অধিকার লঙ্ঘনই নয়, বরং একটি পরিবার ও সমাজকে অন্ধকার ভবিষ্যতের দিকে ঠেলে দেয়।”
তিনি আরও বলেন,“যৌতুকপ্রথা নারীর সম্মান, নিরাপত্তা ও অধিকারকে চরমভাবে ক্ষুণ্ন করে। বর্তমানে সমাজের একটি অংশ মাদক, গাঁজা, ইয়াবা ও অনলাইন জুয়ায় আসক্ত হয়ে পড়ছে। নানা কৌশলে তরুণরা মেয়েদের আকৃষ্ট করে একপর্যায়ে অজ্ঞাত স্থানে নিয়ে যায়। ফলে অনেক ক্ষেত্রে অভিভাবকরা সামাজিক চাপে পড়ে শিশুদের বাল্যবিবাহ দিতে বাধ্য হন।”
ওসি জাহিদুল ইসলাম জাহাঙ্গীর বলেন, বয়স ও মানসিক পরিপক্বতা না থাকায় মেয়েরা সংসার ও জীবনের দায়িত্ব বুঝতে পারে না। এর ফলে সংসার ভেঙে যায় এবং শুরু হয় একটি দুর্বিষহ জীবন, যেখান থেকে অনেক সময় আর ঘুরে দাঁড়ানোর সুযোগ থাকে না।
তিনি অভিভাবকদের উদ্দেশে বলেন,“মেয়ের বিয়ে দেওয়ার আগে অবশ্যই দেখতে হবে ছেলেটি মাদকাসক্ত কিংবা অনলাইন জুয়ায় জড়িত কিনা। বাল্যবিবাহ কোনোভাবেই আশীর্বাদ নয়—এটি একটি ভয়াবহ অভিশাপ।”
এসময় তিনি মাদক, অনলাইন জুয়া, ইভটিজিং ও বাল্যবিবাহসহ বিভিন্ন অপরাধ সম্পর্কে তথ্য দিয়ে পুলিশকে সহায়তা করার আহ্বান জানান এবং নির্ভয়ে যেকোনো বিষয়ে থানায় যোগাযোগ করার অনুরোধ করেন।
সভায় নবম শ্রেণির শিক্ষার্থী রুহান বিনতে রউফ, আফিফা আক্তার, পুষ্পসহ আরও কয়েকজন শিক্ষার্থী বলেন,“আমরা লেখাপড়া করে দেশকে এগিয়ে নিতে চাই। আমাদের কেউ বাল্যবিয়ে দিতে চাইলে আমরা প্রতিবাদ করব। কোনো মেয়েকে জোর করে বাল্যবিয়ে দিতে চাইলে আমরা শিক্ষক, সাংবাদিক ও প্রশাসনকে জানাব। মেয়েরা আজ বিশ্বের সব ক্ষেত্রে সাফল্য অর্জন করছে—আমরাও পিছিয়ে থাকতে চাই না।”
সভাপতির বক্তব্যে সহকারী প্রধান শিক্ষক রনজিৎ কুমার বাইন বলেন,
“বাল্যবিবাহ ও যৌতুকের বিরুদ্ধে সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে। কোনো মেয়ের জীবন অকালেই নষ্ট হতে দেওয়া যাবে না। আজকের মেয়েরাই আগামী দিনের দেশ গড়ার কারিগর—তাদের যোগ্য নাগরিক হিসেবে গড়ে তোলা আমাদের নৈতিক দায়িত্ব।”
সভায় আরও বক্তব্য রাখেন সাংবাদিক মোঃ খোরশেদ আলম, শিক্ষক আঃ সবুর, অরুণ মন্ডল, আঞ্জুমান আরা, অরুন্ধতী বালা, চম্পাবতী তরফদারসহ অন্যান্যরা।
বক্তারা বাল্যবিবাহ ও যৌতুক বন্ধে সামাজিক আন্দোলন গড়ে তোলার আহ্বান জানান এবং একই সঙ্গে অভিভাবকদের আরও সচেতন ও দায়িত্বশীল হওয়ার অনুরোধ জানান।