March 7, 2026, 7:16 am

ঝিনাইদহে ভোটের মাঠ উত্তপ্ত: ধানের শীষের আসনে জামায়াতের আগ্রাসন, ব্যাকফুটে নয় বিএনপি

অভয়নগর প্রতিবেদক

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে ঝিনাইদহ জেলার চারটি আসনে ভোটের রাজনীতি এখন চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছেছে। ধানের শীষের ঐতিহ্যবাহী ঘাঁটিতে জামায়াতের সংগঠিত তৎপরতা এবং হারানো আসন পুনরুদ্ধারে বিএনপির মরিয়া প্রচেষ্টায় জেলার রাজনৈতিক মাঠে তৈরি হয়েছে তীব্র উত্তেজনা ও অনিশ্চয়তা। আওয়ামী লীগ নির্বাচনী মাঠে না থাকায় এবারের নির্বাচনে ঝিনাইদহে মূলত বিএনপি ও জামায়াতের মধ্যেই সরাসরি প্রতিদ্বন্দ্বিতা গড়ে উঠেছে।
প্রতীক বরাদ্দের পর থেকেই প্রার্থীদের প্রচার-প্রচারণা আরও জোরালো হয়েছে। গ্রামগঞ্জে বাড়ি বাড়ি গিয়ে ভোট প্রার্থনা, উঠান বৈঠক, মাইকিং ও লিফলেট বিতরণে ব্যস্ত সময় পার করছেন নেতাকর্মীরা। একই সঙ্গে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পাল্টাপাল্টি প্রচারণা, অভিযোগ ও উত্তেজনাও স্পষ্ট হয়ে উঠছে। কোথাও কোথাও আচরণবিধি লঙ্ঘনের অভিযোগ উঠলেও প্রশাসনের পক্ষ থেকে কঠোর নজরদারির কথা জানানো হয়েছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ঝিনাইদহের চারটি আসনেই নতুন ও তরুণ ভোটারের সংখ্যা উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। প্রায় ৯৫ হাজার নতুন ভোটার এবারের নির্বাচনে যুক্ত হয়েছেন, যা ভোটের সমীকরণ বদলে দিতে পারে। এই তরুণ ভোটারদের মন জয় করতে প্রার্থীরা কর্মসংস্থান, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা ও স্থানীয় উন্নয়নের প্রতিশ্রুতি তুলে ধরছেন।
ঝিনাইদহ-১: বিএনপির পুনরুদ্ধারের চেষ্টা, জামায়াতের শক্ত চ্যালেঞ্জ
শৈলকুপা উপজেলা নিয়ে গঠিত ঝিনাইদহ-১ আসনে মোট ভোটার ৩ লাখ ২৫ হাজার ২৭৮ জন। অতীতে আওয়ামী লীগের প্রভাব থাকলেও এবারের নির্বাচনে সেই চিত্র বদলে গেছে। বিএনপির প্রার্থী সাবেক অ্যাটর্নি জেনারেল আসাদুজ্জামানকে ঘিরে দলীয় নেতাকর্মীরা আশাবাদী। স্থানীয় বিএনপি নেতাদের দাবি, সামাজিক গ্রহণযোগ্যতা ও উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ডে তিনি এগিয়ে রয়েছেন।
অন্যদিকে জামায়াতের প্রার্থী আবু ছালেহ মো. মতিউর রহমান নিয়মিত গণসংযোগ চালিয়ে শক্ত অবস্থান তৈরির চেষ্টা করছেন। দুই পক্ষের মধ্যে পাল্টাপাল্টি অভিযোগ, হামলা ও হুমকির বক্তব্য নির্বাচনী উত্তেজনাকে আরও বাড়িয়ে তুলছে।
ঝিনাইদহ-২: বিএনপির ঘাঁটিতে জামায়াতের নীরব অগ্রযাত্রা
ঝিনাইদহ সদর ও হরিণাকুণ্ডু উপজেলা নিয়ে গঠিত ঝিনাইদহ-২ আসনকে জেলার রাজনৈতিক কেন্দ্র বলা হয়। এখানে মোট ভোটার ৫ লাখ ৬ হাজার ৬৪০ জন। বিএনপির প্রার্থী আব্দুল মজিদকে দলীয়ভাবে এগিয়ে রাখা হলেও জামায়াত প্রার্থী আলী আজম মোহাম্মদ আবু বকর নীরবে সাংগঠনিক শক্তি বাড়াচ্ছেন। বিশেষ করে নারী ভোটারদের মধ্যে জামায়াতের সক্রিয় প্রচারণা বিএনপির জন্য নতুন চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
স্থানীয় নেতাদের মতে, দলীয় ঐক্য অটুট থাকলে বিএনপি এগিয়ে থাকবে। তবে অভ্যন্তরীণ কোন্দল নির্বাচনী ফলাফলে প্রভাব ফেলতে পারে বলেও আলোচনা রয়েছে।
ঝিনাইদহ-৩: পুরনো ঘাঁটি ধরে রাখার লড়াই
এই আসনে মোট ভোটার সংখ্যা ৪ লাখ ৩৩ হাজার ১৫ জন। বিএনপির প্রার্থী মেহেদী হাসান রনিকে কেন্দ্র করে দলীয় নেতাকর্মীরা মাঠে সক্রিয় থাকলেও জামায়াতের প্রার্থী মতিয়ার রহমান পরিবর্তনের বার্তা দিয়ে ভোটারদের আকৃষ্ট করার চেষ্টা করছেন। ভোটের শেষ মুহূর্তে এ আসনেও হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ের সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে।
ঝিনাইদহ-৪: বিদ্রোহী প্রার্থীতে জটিল সমীকরণ
কালীগঞ্জ ও আশপাশের এলাকা নিয়ে গঠিত ঝিনাইদহ-৪ আসনে ত্রিমুখী লড়াই সবচেয়ে বেশি আলোচনায় রয়েছে। বিএনপির প্রার্থী রাশেদ খান, জামায়াতের প্রার্থী মাওলানা আবু তালিব এবং স্বতন্ত্র প্রার্থী সাইফুল ইসলাম ফিরোজের উপস্থিতিতে ভোটের অঙ্ক জটিল হয়ে উঠেছে। মোট ৩ লাখ ৩০ হাজার ৪৬৪ ভোটারের এই আসনে সামান্য ভোট বিভাজনেই ফলাফল পাল্টে যেতে পারে বলে রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের ধারণা।
প্রশাসনের প্রস্তুতি
জেলা রিটার্নিং কর্মকর্তা মো. আব্দুল্লাহ আল মাসুউদ জানিয়েছেন, ঝিনাইদহে সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণ নির্বাচন নিশ্চিত করতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থানে রয়েছে। ঝুঁকিপূর্ণ কেন্দ্রগুলোতে বাড়তি নিরাপত্তা, ভ্রাম্যমাণ আদালত এবং নিয়মিত মনিটরিংয়ের ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।
সব মিলিয়ে আওয়ামী লীগবিহীন নির্বাচনী মাঠে ঝিনাইদহে এবারের নির্বাচন শুধু আসন জয়ের লড়াই নয়—বরং রাজনৈতিক শক্তির পুনর্বিন্যাস এবং ভবিষ্যৎ নেতৃত্ব নির্ধারণের একটি বড় পরীক্ষায় পরিণত হয়েছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।



ফেসবুক কর্নার