June 23, 2026, 2:25 pm
শিরোনাম :
পঞ্চগড়ে মাতৃত্বকালীন ভাতায় স্বজনপ্রীতির অভিযোগ যোগ্যরা বঞ্চিত, সুবিধা পাচ্ছেন অযোগ্যরা; তদন্তের আশ্বাস প্রশাসনের অপপ্রচার ও দেশবিরোধী ষড়যন্ত্রের প্রতিবাদে মানিকগঞ্জজুড়ে বিএনপির বিক্ষোভ অতীতের দর্পণে গ্রামবাংলা: হারিয়ে যাওয়া সোনালি স্মৃতির ব্যবচ্ছেদ চট্টগ্রাম বন্দরের এনসিটিতে আরটিজি ক্রেনে আগুন, ক্ষতিগ্রস্ত ৪ কনটেইনার কুড়িগ্রামে প্রবাসীর স্ত্রীকে ধর্ষণচেষ্টা: দেশীয় অস্ত্রসহ ইউপি সদস্য গণধোলাইয়ের পর পুলিশে সোপর্দ ধানমন্ডিতে ‘আওয়ামী লীগের দোসর’ আখ্যা দিয়ে সাংবাদিকের উপর হামলা শাহজালালের মাজারের দানবাক্সে ৪ দিনে মিলল ১৭ লাখ ৬৫ হাজার টাকা নিষিদ্ধ সংগঠনের অপতৎপরতার প্রতিবাদে কুষ্টিয়ায় বিএনপির বিক্ষোভ মিছিল ও সমাবেশ বিশ্বকাপে এখন পর্যন্ত সর্বোচ্চ ৫ গোল মেসির, সমান ৪ গোল করে ২য়-৩য় অবস্থানে এমবাপ্পে-হালান্ড মেসির জোড়া গোলে নকআউটে আর্জেন্টিনা

অতীতের দর্পণে গ্রামবাংলা: হারিয়ে যাওয়া সোনালি স্মৃতির ব্যবচ্ছেদ

কাইয়ুম হাসান, স্টাফ রিপোর্টার, ঠাকুরগাঁও

সময়ের প্রবল স্রোতে বদলে গেছে গ্রামবাংলার চিরচেনা রূপ। প্রযুক্তি, আধুনিকতা ও নগরায়নের প্রভাবে আজকের গ্রাম আর আগের সেই সহজ-সরল, প্রাণবন্ত ও আন্তরিক গ্রাম নয়। একসময় যে গ্রামীণ জীবন পারস্পরিক ভালোবাসা, সহযোগিতা ও মানবিক বন্ধনে পরিপূর্ণ ছিল, আজ তার অনেকটাই স্মৃতির পাতায় স্থান করে নিয়েছে।
এক-দুই দশক আগেও গ্রামবাংলার ভোর শুরু হতো পাখির কলতান, মোরগের ডাক আর গৃহস্থালির ব্যস্ততায়। কৃষকরা লাঙল-গরু নিয়ে মাঠে যেতেন, আর বাড়ির আঙিনায় চলত ধান ভানা, চাল কুটা কিংবা শাকসবজি প্রস্তুতের কাজ। জীবন ছিল কষ্টসাধ্য, কিন্তু তাতে ছিল এক ধরনের প্রশান্তি ও তৃপ্তি, যা আজকের যান্ত্রিক জীবনে অনেকটাই অনুপস্থিত।
গ্রামের শৈশব ছিল নির্মল আনন্দে ভরা। বিকেলের মাঠ মানেই ছিল হাডুডু, দাড়িয়াবান্ধা, গোল্লাছুট, কানামাছি কিংবা লাঠিখেলার উচ্ছ্বাস। আবার অনেকেই বন্ধুদের সঙ্গে ক্রিকেট বা ফুটবল খেলায় মেতে উঠত। দৌড়ঝাঁপ, হাসি-আনন্দ আর হৈচৈ ছিল গ্রামীণ জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ। দিনের শেষে মা-বাবার বকুনি কিংবা শিক্ষকের শাসনও আজ মধুর স্মৃতিতে পরিণত হয়েছে।
গ্রামীণ সংস্কৃতির অন্যতম আকর্ষণ ছিল যাত্রাপালা। এটি শুধু বিনোদনের মাধ্যম নয়, ছিল আবেগ, ঐতিহ্য ও সামাজিক মিলনের এক বিশাল ক্ষেত্র। গ্রামের খোলা মাঠ, বড় বটগাছের নিচে কিংবা হাটের পাশে বসত জমজমাট যাত্রার আসর। সন্ধ্যা নামলেই আশপাশের গ্রাম থেকে মানুষ দল বেঁধে ছুটে আসত। কারও হাতে লণ্ঠন, কারও হাতে কেরোসিনের বাতি—আলো-আঁধারের সেই পরিবেশ সৃষ্টি করত এক অন্যরকম আবহ।
অনেক কিশোর-যুবক পরিবারের চোখ এড়িয়ে চুপিচুপি যাত্রা দেখতে যেত। গভীর রাত পর্যন্ত নাটকের সংলাপ, গান ও অভিনয়ে মুগ্ধ হয়ে থাকত তারা। যাত্রা শেষে কুয়াশা ভেজা ভোরে বা রাতের নিস্তব্ধতায় বাড়ি ফেরার পথে চলত হাসাহাসি, গল্প আর স্মৃতিচারণ। বাড়ি ফিরে অপেক্ষা করত মা-বাবার বকুনি, কিন্তু এসবের মধ্যেই লুকিয়ে ছিল এক অপূর্ব আনন্দ, যা আজকের প্রজন্ম কেবল গল্পেই শুনতে পায়।
পূর্বপুরুষদের জীবনধারা ছিল আরও সরল, কিন্তু গভীর মূল্যবোধে ভরা। তারা অল্পতেই সন্তুষ্ট থাকতেন, পরিশ্রমকে জীবনের অংশ হিসেবে গ্রহণ করতেন এবং একে অপরের প্রতি ছিল অগাধ শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা। গ্রামের কোনো পরিবার বিপদে পড়লে সবাই মিলে এগিয়ে আসত। মুরব্বিদের কথা ছিল অমূল্য, তাদের সিদ্ধান্তই ছিল সবার কাছে গ্রহণযোগ্য।
সন্ধ্যা নামলেই উঠোনভরা আড্ডা, লোককথা, গল্প আর জীবনের নানা শিক্ষা ভাগাভাগির পরিবেশ তৈরি হতো। হারিকেন বা কেরোসিনের বাতির আলোয় চলত পড়াশোনা, যেখানে স্বপ্ন ছিল বড়, কিন্তু চাওয়া ছিল সীমিত।
গ্রামের হাট-বাজার ছিল প্রাণের স্পন্দন। সপ্তাহে একদিন বসা সেই হাট শুধু কেনাবেচার স্থান ছিল না, বরং ছিল সামাজিক সম্পর্কের এক প্রাণকেন্দ্র। কৃষিপণ্য, তাজা মাছ, দুধ, ঘি কিংবা হাতে তৈরি জিনিসে ছিল দেশীয়তার নিজস্ব গন্ধ।
বর্তমান বাস্তবতা ভিন্ন। স্মার্টফোন, ইন্টারনেট ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম মানুষের জীবনকে সহজ করলেও কমিয়ে দিয়েছে সামাজিক মেলবন্ধন। এখনকার শিশুরা মাঠের খেলায় নয়, বরং স্ক্রিনে বেশি সময় কাটায়। উঠোনভরা আড্ডা হারিয়ে গেছে, কমে গেছে প্রতিবেশীদের সঙ্গে আন্তরিক সম্পর্ক।
পরিবর্তন অনিবার্য—এটাই সময়ের দাবি। তবে উন্নয়নের এই অগ্রযাত্রায় যদি আমরা পূর্বপুরুষদের মূল্যবোধ, পারস্পরিক ভালোবাসা ও ঐতিহ্যকে ধারণ করতে পারি, তবে একটি সুস্থ, মানবিক ও সমৃদ্ধ সমাজ গড়ে তোলা সম্ভব।
গ্রামবাংলার সেই সোনালি দিনগুলো হয়তো আর ফিরে আসবে না, কিন্তু তার শিক্ষা, সৌন্দর্য ও মানবিকতার চর্চা ভবিষ্যৎ প্রজন্মের মাঝে ছড়িয়ে দেওয়াই হতে পারে আমাদের সবচেয়ে বড় দায়িত্ব।



ফেসবুক কর্নার