সাতক্ষীরার শ্যামনগর উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) হিসেবে দায়িত্ব পালন শেষে যশোরের ঝিকরগাছা উপজেলায় বদলি হওয়া মোছা. রনি খাতুনকে ঘিরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শুরু হয়েছে তীব্র বিতর্ক ও সমালোচনা। অভিযোগ উঠেছে, জনতার শত শত মন্তব্য উপেক্ষা করে তিনি প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন শুধুমাত্র আওয়ামী লীগের সাবেক সংসদ সদস্যের মন্তব্যে, যা একজন প্রশাসনিক কর্মকর্তার নিরপেক্ষতা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন তৈরি করেছে।
জানা যায়, মোছা. রনি খাতুন ২০২৪ সালের ১৩ নভেম্বর শ্যামনগর উপজেলা নির্বাহী অফিসার হিসেবে যোগদান করেন এবং ২০২৫ সালের ২৭ অক্টোবর যশোরের ঝিকরগাছা উপজেলায় বদলি হন। ঝিকরগাছায় যোগদানের পর গত ১৫ ডিসেম্বর শ্যামনগর থেকে একদল শুভাকাঙ্ক্ষী তার সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে সেখানে যান। এ সময় ঘণ্টাব্যাপী চা-চক্র অনুষ্ঠিত হয় এবং শেষে ইউএনও রনি খাতুন শুভাকাঙ্ক্ষীদের সঙ্গে ছবি তোলেন।
এই সাক্ষাৎ শেষে আবেগাপ্লুত হয়ে তিনি নিজের ব্যক্তিগত ফেসবুক আইডি থেকে একটি দীর্ঘ আবেগঘন পোস্ট দেন। সেখানে তিনি লেখেন
“২০১৭ সালের ০২ মে প্রশাসন ক্যাডারে যোগদান করি। প্রায় ৯ বছরের চাকরি জীবনের শ্রেষ্ঠতম সময় কাটিয়েছি ‘লোনা জলে জীবন জ্বলে’ এলাকায় আমার শ্যামনগরে। আমি আর কখনো এত বেশি ভালোবাসা ও সম্মান পাবো কিনা জানি না… আমার শ্যামনগর আমার হৃদয়ে।”
তিনি আরও উল্লেখ করেন, প্রায় ২০৪ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়ে যেভাবে মানুষ তাকে দেখতে এসেছেন, তা বাবার বাড়ির লোকজন মেয়েকে দেখতে যাওয়ার সঙ্গে তুলনা করেন। পোস্টটি মুহূর্তেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হয় এবং শতাধিক মানুষ সেখানে মন্তব্য করে ভালোবাসা ও সম্মান প্রকাশ করেন।
কিন্তু বিতর্কের সূচনা হয় অন্য জায়গায়। অভিযোগ উঠেছে, সাধারণ মানুষের অসংখ্য মন্তব্যে কোনো প্রতিক্রিয়া না জানালেও শ্যামনগর-০৪ আসনের আওয়ামী লীগের সাবেক সংসদ সদস্য এস এম আতাউল হক দোলনের মন্তব্যে ইউএনও রনি খাতুন সরাসরি উত্তর দেন।
উল্লেখ্য, এস এম আতাউল হক দোলন ২৪ জুলাই গণঅভ্যুত্থান আন্দোলনে ছাত্র-জনতা হত্যার মামলার আসামি বলে স্থানীয়ভাবে অভিযোগ রয়েছে। সামনে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন এমন প্রেক্ষাপটে একজন সম্ভাব্য রিটার্নিং কর্মকর্তার এই আচরণ এলাকাজুড়ে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করেছে।
সচেতন মহলের প্রশ্ন, একজন প্রশাসনের শীর্ষ দায়িত্বশীল কর্মকর্তা কি রাজনৈতিক পরিচয়ের ভিত্তিতে মন্তব্যে সাড়া দিতে পারেন? জনগণের শত শত মন্তব্য উপেক্ষা করে কেবলমাত্র একজন সাবেক ক্ষমতাসীন দলের এমপির মন্তব্যে প্রতিক্রিয়া জানানো কি প্রশাসনিক নিরপেক্ষতার পরিপন্থী নয়?
সচেতন নাগরিকরা বলছেন, একজন উপজেলা নির্বাহী অফিসার রাজনৈতিকভাবে নিরপেক্ষ থাকার সাংবিধানিক ও নৈতিক শপথ নিয়েছেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এমন পক্ষপাতমূলক আচরণ প্রশাসনের পেশাদারিত্ব ও গ্রহণযোগ্যতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করে। এতে সাধারণ মানুষের মধ্যে বিভ্রান্তি ও অনাস্থা তৈরি হচ্ছে।
এ বিষয়ে ইউএনও মোছা. রনি খাতুন বলেন,
“এস এম আতাউল হক দোলন একজন সম্মানিত ব্যক্তি। তাকে সম্মান জানানো কি আমার অপরাধ? যারা এসব করছে, তাদের আমি কী ক্ষতি করেছি? আপনি ভাই আইসেন, ঝিকরগাছা দাওয়াত রইলো।”
তবে এই বক্তব্যেও সমালোচনা থামেনি। বরং দায়িত্বশীল একজন কর্মকর্তার মুখে এমন ভাষা ও অবস্থান পরিস্থিতিকে আরও বিতর্কিত করেছে বলে মনে করছেন অনেকেই।
এ বিষয়ে এখন পর্যন্ত ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে কোনো আনুষ্ঠানিক ব্যাখ্যা পাওয়া যায়নি। তবে শ্যামনগর ও ঝিকরগাছা জুড়ে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা-সমালোচনার ঝড় বইছে।