
ব্রিটিশ শাসনামলে রংপুর অঞ্চলের রৌমারী ছিল শিক্ষা, যোগাযোগ ও অর্থনৈতিক দিক থেকে অত্যন্ত অনগ্রসর একটি সীমান্তবর্তী জনপদ। দারিদ্র্য, যোগাযোগ ব্যবস্থার দুর্বলতা ও সরকারি শিক্ষাব্যবস্থার অনুপস্থিতির কারণে এ অঞ্চলের সাধারণ মানুষের জন্য শিক্ষা ছিল প্রায় অধরা। প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান তো দূরের কথা, শিক্ষিত শিক্ষকও তখন ছিল দুর্লভ। ফলে শিক্ষার আলো সীমাবদ্ধ ছিল অল্প কিছু বিত্তশালী জমিদার পরিবারের মধ্যেই।
এই পশ্চাৎপদ সমাজব্যবস্থার মধ্যেই জন্ম নিয়েছিলেন একজন ক্ষণজন্মা প্রতিভা—অধ্যাপক ইমান আলী। বর্তমান কুড়িগ্রাম জেলার রৌমারী উপজেলার পূর্ব পাখীউড়া গ্রামের কৃষক মহর উদ্দিন মুন্সীর জ্যেষ্ঠ সন্তান ইমান আলীর জন্ম ১৯২৬ সালের ১ ফেব্রুয়ারি। পেশায় কৃষক হলেও মহর উদ্দিন মুন্সী ছিলেন শিক্ষানুরাগী ও সমাজসচেতন মানুষ। সীমিত সামর্থ্যের মধ্যেও তিনি তাঁর সন্তানদের শিক্ষিত করে তোলার চেষ্টা করেন, যা সে সময়ের প্রেক্ষাপটে ছিল ব্যতিক্রমী উদ্যোগ।
অধ্যাপক ইমান আলীর শিক্ষাজীবনের শুরু নিজ গ্রামের পাঠশালায়। পরে তিনি পাশের গ্রামের একটি মক্তবে (বর্তমান টাপুর চর মক্তব মাদ্রাসা) অধ্যয়ন করেন। রৌমারীতে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান না থাকায় মাত্র ১০ বছর বয়সে পড়াশোনার উদ্দেশ্যে তিনি চলে যান আসামের ধুবড়ীতে, যেখানে তাঁর নানাবাড়ি ছিল। সেখানে সুখচর মিডল ইংলিশ স্কুলে তৃতীয় শ্রেণিতে ভর্তি হয়ে তিনি অসাধারণ মেধার স্বাক্ষর রাখেন। ১৯৩৯ সালে আসাম মাধ্যমিক ইংরেজি স্কুল সার্টিফিকেট পরীক্ষায় প্রথম বিভাগে উত্তীর্ণ হয়ে আসাম প্রদেশে প্রথম স্থান অর্জন করেন।
পরবর্তীতে ধুবড়ী সরকারি উচ্চ বিদ্যালয় থেকে ১৯৪৪ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে অনুষ্ঠিত ম্যাট্রিক পরীক্ষায় দুই বিষয়ে লেটার নম্বরসহ প্রথম বিভাগে উত্তীর্ণ হন। পূর্ব বাংলার ছাত্রদের মধ্যে তিনিই ছিলেন সর্বোচ্চ কৃতিত্ব অর্জনকারী। এরপর তিনি গৌহাটি কলেজে আইএসসি শ্রেণিতে ভর্তি হন এবং সর্বোচ্চ নম্বর অর্জন করলেও জন্মস্থান বঙ্গ প্রদেশ হওয়ায় বৃত্তি থেকে বঞ্চিত হন। আর্থিক সংকটে ১৯৪৫ সালে করোটিয়া সাদত কলেজে ভর্তি হয়ে গণিত বিষয়ে আইএ শ্রেণিতে অধ্যয়ন শুরু করেন।
১৯৪৭ সালে তিনি ঢাকা বিভাগে প্রথম স্থান অধিকার করে আইএ পাশ করেন এবং একই বছর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণিত বিভাগে অনার্স শ্রেণিতে ভর্তি হন। ১৯৫০ সালে বিএ (সম্মান) পরীক্ষায় প্রথম শ্রেণিতে প্রথম স্থান অর্জন করে তিনি গণিত প্রতিভার অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেন। ১৯৫২ সালে ফলিত গণিতে এমএ পরীক্ষায় দ্বিতীয় শ্রেণিতে প্রথম হন।
কর্মজীবনে অধ্যাপক ইমান আলী প্রথমে শিক্ষকতা করেন উচ্চ বিদ্যালয়ে। ১৯৫৩ সালে তিনি জগন্নাথ কলেজে গণিত বিভাগের লেকচারার হিসেবে যোগদান করেন এবং ১৯৬২ সাল পর্যন্ত বিভাগীয় প্রধানের দায়িত্ব পালন করেন। একই বছরের ২১ নভেম্বর তিনি তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ে (বর্তমান বুয়েট) গণিত বিভাগের প্রথম দেশীয় শিক্ষক হিসেবে যোগদান করেন। তিনি সেখানে সহযোগী অধ্যাপক হিসেবে দীর্ঘদিন পাঠদান করেন।
১৯৬৬ সালে যুক্তরাষ্ট্রের কলোরাডো বিশ্ববিদ্যালয়ে পিএইচডি গবেষণার সুযোগ পেলেও শারীরিক অসুস্থতার কারণে তা সম্পন্ন করতে পারেননি। শ্বেতী ও ডায়াবেটিসসহ নানা জটিল রোগের সঙ্গে লড়াই করেও তিনি গণিত শিক্ষায় অনন্য অবদান রাখেন। তাঁর রচিত পাঠ্যগ্রন্থগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য— Plane Trigonometry, Intermediate Geometry, Commercial Mathematics, Matrices and Linear Transformation এবং Tensor Analysis।
১৯৫০ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে সর্বোচ্চ কৃতিত্বের জন্য তিনি নীলকান্ত সরকার স্বর্ণপদক লাভ করেন। জগন্নাথ কলেজ ও অন্যান্য প্রতিষ্ঠান থেকেও তিনি একাধিক সম্মাননা অর্জন করেন।
ব্যক্তিজীবনে তিনি বগুড়ার সারিয়াকান্দির নবাব পরিবারের কন্যা রহিমা খাতুনের সঙ্গে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন, যিনি পরে রহিমা ইমান নামে পরিচিত হন। অধ্যাপক ইমান আলীর রচিত সব গণিত বইয়ের চিত্রাঙ্কন ও জ্যামিতিক অঙ্কন তাঁর স্ত্রী নিজ হাতে সম্পন্ন করেন এবং তিনি তাঁর সব গ্রন্থ স্ত্রীর নামেই উৎসর্গ করেন। ১৯৮৬ সালে এক সড়ক দুর্ঘটনায় স্ত্রীর মৃত্যু তাঁর জীবনে গভীর শূন্যতা সৃষ্টি করে।
নিঃসন্তান, শারীরিকভাবে অসুস্থ ও একাকী জীবনযাপনকারী এই মহৎ শিক্ষাবিদ ১৯৯৬ সালের ৯ সেপ্টেম্বর ঢাকার নিজ বাসভবনে মৃত্যুবরণ করেন। পরে তাঁকে পারিবারিক কবরস্থানে পিতা-মাতার পাশে সমাহিত করা হয়।
অধ্যাপক ইমান আলীর জীবন ও দর্শন আজও শিক্ষার্থীদের অনুপ্রেরণা জোগায়। তিনি বলতেন—
“সুন্দর জীবন মানে জ্ঞান অর্জন, সৎ উপায়ে উপার্জন এবং মহৎ কিছু করার অদম্য ইচ্ছা।”
এই জন্মশতবর্ষে জাতি শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করছে এক নীরব গণিত সাধক, যিনি আলো ছড়িয়েছিলেন অন্ধকার জনপদ থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ের শ্রেণিকক্ষ পর্যন্ত।