“তিনি এমন একজন হবেন, যাকে আমেরিকা ঘৃণা করবে।” — দুদিন আগে ইরানি এক কর্মকর্তার করা এই মন্তব্যটি আজ যেন এক অমোঘ ভবিষ্যদ্বাণীতে পরিণত হয়েছে। বিশ্বরাজনীতির সমীকরণকে চমকে দিয়ে ইরান তাদের নতুন সর্বোচ্চ নেতা হিসেবে বেছে নিয়েছে মুজতবা খামেনিকে। এমন এক নাম, যাকে ঘিরে পশ্চিমা বিশ্বের অস্বস্তি দীর্ঘদিনের। ইসরাইল ইতিপূর্বেই হুঁশিয়ারি দিয়েছে যে, ইরানের সর্বোচ্চ নেতা যেই হোন না কেন, তিনি তাদের লক্ষ্যবস্তু হবেন। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র সরাসরি জানিয়েছে, মুজতবা খামেনিকে তারা মেনে নেবে না। এত বড় দুই শক্তির প্রকাশ্য হুমকি ও নিষেধাজ্ঞার পাহাড় ডিঙিয়ে ইরান কেন মুজতবা খামেনিকেই বেছে নিল? কোন সাহসে এবং কোন আত্মবিশ্বাসে?
ইরানের ক্ষমতার উৎস কোনো একক ব্যক্তির ওপর নয়, বরং এটি দাঁড়িয়ে আছে কয়েকটি শক্তিশালী ও সুসংগঠিত কাঠামোর ওপর। এর মধ্যে রয়েছে শক্তিশালী বিপ্লবী গার্ড বাহিনী (IRGC), বিশাল গোয়েন্দা নেটওয়ার্ক, ধর্মীয় নেতৃত্বের মজবুত প্রতিষ্ঠান এবং বাসিজ মিলিশিয়া। এই কাঠামো এতটাই শিকড়বদ্ধ যে, বাইরের কোনো চাপে তাদের সিদ্ধান্ত বদলানো প্রায় অসম্ভব।
মুজতবা খামেনির শক্তির আসল জায়গাটি হলো তার নেপথ্য চারিত্রিক দৃঢ়তা। তিনি জনসমাবেশে আসার চেয়ে পর্দার আড়ালে থেকে কৌশল সাজাতে বেশি পছন্দ করেন। তার শক্তির তিনটি প্রধান স্তম্ভ রয়েছে: প্রথমত, বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর সঙ্গে তার অত্যন্ত নিবিড় সম্পর্ক, যা মধ্যপ্রাচ্যের সামরিক ক্ষমতার মূল কেন্দ্র। দ্বিতীয়ত, দীর্ঘদিনের অভ্যন্তরীণ প্রভাব; বলা হয় তিনি দীর্ঘদিন ধরে ইরানের গুরুত্বপূর্ণ সব সিদ্ধান্তের নেপথ্য কারিগর ছিলেন। তৃতীয়ত, ধর্মীয় নগরী কুমের প্রভাবশালী আলেমদের সঙ্গে তার গভীর যোগাযোগ।
তবে মুজতবা খামেনির সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো অভ্যন্তরীণ গ্রহণযোগ্যতা। ইরানের সমাজ বর্তমানে তিনটি ধারায় বিভক্ত। একদল যারা ইসলামী বিপ্লবের আদর্শে অবিচল, তারা এই নেতৃত্বকে স্বাগত জানিয়েছে। দ্বিতীয় দল হলো বাস্তববাদী, যাদের কাছে নেতার চেয়েও দেশের স্থিতিশীলতা ও অর্থনীতি বড়। আর তৃতীয় অংশটি হলো সংস্কারপন্থী, যারা এই নেতৃত্বকে সহজে মেনে নিতে নারাজ হতে পারে।
আঞ্চলিক রাজনীতির হিসেবে মুজতবা খামেনি কেন বিপজ্জনক? কারণ, ইরান গত কয়েক দশকে মধ্যপ্রাচ্যে একটি শক্তিশালী ‘প্রক্সি নেটওয়ার্ক’ গড়ে তুলেছে। লেবাননের হিজবুল্লাহ, ইরাকের মিলিশিয়া বাহিনী, ইয়েমেনের হুথি এবং সিরিয়ার মিত্র শক্তিগুলো ইরানের এক একটি ঢাল। কেউ যদি সরাসরি ইরানকে আঘাত করে, তবে সেই আগুনের লেলিহান শিখা পুরো মধ্যপ্রাচ্যে ছড়িয়ে পড়বে।
ইরানের হাতে রয়েছে বিশাল ক্ষেপণাস্ত্র ভাণ্ডার এবং হরমুজ প্রণালীর মতো গুরুত্বপূর্ণ ভূ-রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণ। যদিও কঠোর অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা এবং প্রযুক্তিতে কিছুটা পিছিয়ে থাকা তাদের বড় দুর্বলতা, তবুও বাস্তবতা হলো—যুক্তরাষ্ট্র ইরানকে সহজে ভাঙতে পারবে না, আবার ইরানও যুক্তরাষ্ট্রকে সরাসরি পরাজিত করতে পারবে না।
এখন বড় প্রশ্ন হলো, মুজতবা খামেনির নেতৃত্ব কি ইরানকে আরও কঠোর সংঘাতের দিকে নিয়ে যাবে? নাকি তিনি নতুন কোনো কৌশলী চালে মধ্যপ্রাচ্যের ক্ষমতার ভারসাম্যে পরিবর্তন আনবেন? ইতিহাস হয়তো এখনো এর উত্তর দেয়নি, তবে ওয়াশিংটনের জন্য যে মুজতবা খামেনি এক নতুন এবং দীর্ঘস্থায়ী দুঃস্বপ্ন হতে যাচ্ছেন, তা এখন অনেকটাই স্পষ্ট।