২০২২ সালের সেই ভয়াবহ স্মৃতি আজও সাধারণ মানুষের মনে দগদগে। সে বছর আগস্টে ডিজেলের দাম এক লাফে ৮০ টাকা থেকে ১১৪ টাকা করা হয়েছিল। জ্বালানি তেলের সেই রেকর্ড দাম বৃদ্ধির অজুহাতে বাস মালিকরা কিলোমিটার প্রতি ভাড়ায় বড় ধরনের উল্লম্ফন ঘটান। কিন্তু সময়ের আবর্তে ২০২৬ সালে এসে দেখা যাচ্ছে এক অদ্ভুত সমীকরণ—ডিজেলের দাম কমলেও ভাড়া কমে না, কিন্তু দাম সামান্য বাড়লেই শুরু হয় ‘ভাড়া নৈরাজ্য’।
২০২২ সালে যখন ডিজেল ১১৪ টাকা হয়েছিল, তখন দূরপাল্লার বাস ভাড়া প্রতি কিলোমিটারে ১.৮০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ২.১৫ – ২.৪২ টাকা পর্যন্ত করা হয়েছিল। পরবর্তীতে আন্তর্জাতিক বাজারের দোহাই দিয়ে ডিজেলের দাম কয়েক দফায় কমে ১০০ টাকার ঘরে নেমে এলেও সাধারণ যাত্রীরা এর সুফল পাননি। বাস মালিকদের অযুহাত ছিল “খুচরা যন্ত্রাংশের দাম বৃদ্ধি”।
আজকের (এপ্রিল ২০২৬) চিত্রটি লক্ষ্য করুন:
•
ডিজেলের বর্তমান দাম: ১১৫ টাকা (২০২২ সালের সর্বোচ্চ দামের চেয়ে মাত্র ১ টাকা বেশি)।
•
মালিক সমিতির দাবি: তারা এখন কিলোমিটার প্রতি ভাড়া ৪ টাকার উপরে (প্রায় ৪.০৫ টাকা) করার প্রস্তাব দিয়েছে। অর্থাৎ প্রায়
৯১% ভাড়া বৃদ্ধির দাবি তোলা হয়েছে।
গত কয়েক বছরে রাজনৈতিক পটপরিবর্তন বা নেতৃত্ব বদল হলেও পরিবহন খাতের ‘সিন্ডিকেট কালচার’ যে বিন্দুমাত্র বদলায়নি, তা এই অযৌক্তিক প্রস্তাব থেকেই স্পষ্ট।
•
বিআরটিএ (BRTA) এর ভূমিকা: ভাড়া নির্ধারণের ক্ষেত্রে বিআরটিএ-র ব্যয় বিশ্লেষণ কমিটি সবসময়ই প্রশ্নের সম্মুখীন। মালিকদের দেওয়া হিসাব (যেমন: টায়ার খরচ, লুব্রিকেন্ট খরচ, বাসের চেসিস মূল্য) যাচাই না করেই অনেক সময় ভাড়ার চার্ট তৈরি করা হয়।
•
সরকারের তদারকি: বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে যেমন ভাড়া কমানোর ক্ষেত্রে কোনো কার্যকর পদক্ষেপ দেখা যায়নি, বর্তমানেও যদি ১ টাকা জ্বালানির দাম বাড়ার বিপরীতে ২ টাকা ভাড়া বাড়ানোর প্রস্তাব আমলে নেওয়া হয়, তবে তার দায়ভার বর্তমান নীতি-নির্ধারকদের ওপরই বর্তাবে।
পরিবহন মালিকদের যুক্তি হলো—২০২২ সালের পর থেকে ডলারের দাম বেড়েছে, বাসের বডি তৈরির খরচ ১১ লাখ থেকে ২০ লাখে ঠেকেছে এবং ব্যাংক ঋণের সুদ ৯% থেকে ১৩% হয়েছে।
জ্বালানি তেলের দাম বাড়লে শুধু সেই অনুপাতেই ভাড়া বাড়া উচিত। যন্ত্রাংশ বা ঋণের সুদের অযুহাত দিয়ে প্রতি বছর ভাড়া পুনর্নির্ধারণ করার কোনো আইনি ভিত্তি নেই। যাত্রী কল্যাণ সমিতির মতে, ডিজেলের দাম ১৫ টাকা বাড়লে বড়জোর ১৫ পয়সা ভাড়া বাড়তে পারে (প্রতি কিলোমিটারে)। সেখানে ১ টাকা বৃদ্ধির জন্য ভাড়াকে চারগুণ করার প্রস্তাব কেবল অযৌক্তিক নয়, বরং সাধারণ জনগণের সাথে এক প্রকার “মশকরা”।
২০২২ সালের ১১৪ টাকা রেটের ডিজেলের ভাড়া মানুষ গত ৪ বছর ধরে দিয়ে আসছে, এমনকি যখন তেলের দাম ১০০ টাকা ছিল তখনও। এখন মাত্র ১ টাকা বৃদ্ধিতে যদি ভাড়া ২ টাকার বেশি বাড়ানো হয়, তবে সাধারণ মানুষের যাতায়াত খরচ আয়ের তুলনায় কয়েক গুণ বেড়ে যাবে।
পরিবহন খাতে এখন আর ব্যক্তি বিশেষের প্রভাব মুখ্য নয়, বরং একটি “প্রাতিষ্ঠানিক সিন্ডিকেট” তৈরি হয়েছে। ১ টাকা তেলের দাম বাড়লে যদি ভাড়া ৯১% বাড়ানোর সাহস তারা পায়, তবে বুঝতে হবে নিয়ন্ত্রণ সংস্থাগুলো এখনো মালিকদের পকেটে। এর দায় শেষ পর্যন্ত বর্তমান সরকারের ওপরই পড়বে যদি তারা জনগণের স্বার্থ রক্ষা করতে না পারে