আবু জাফর সাতক্ষীরা প্রতিনিধিঃজলবায়ু পরিবর্তনের তীব্র প্রভাবে অস্তিত্ব সংকটে পড়েছে সুন্দরবন-সংলগ্ন সাতক্ষীরার শ্যামনগর ও তালা উপজেলার মুন্ডা জনগোষ্ঠী। ভূমিহীনতার পাশাপাশি হারাতে বসেছে তাদের ভাষা, সংস্কৃতি, খাবার ও ঐতিহ্য। একসময় সুন্দরবনের জঙ্গল কেটে বসতি নির্মাণকারী এই সম্প্রদায় এখন প্রকৃতি ও পরিবেশের বিরুদ্ধে দৈনিক যুদ্ধ করে টিকে আছে।
জীবনসংগ্রাম: “জুংড়া ফসল হয় না, ঘরবাড়ি নিয়ে যায় ঝড়”রমজাননগর ইউনিয়নের কালিঞ্চি নদীর পাড়ে বসবাসকারী ৭৯ বছর বয়সী রনজিত মুন্ডা বলেন,“আমাদের আসল বাড়ি রांची। পূর্বপুরুষেরা সুন্দরবন পরিষ্কার করতেন। এখন নোনাপানিতে জুংড়া ফসল হয় না, নদীতে কচ্ছপ-কুঁচিয়া পাওয়া যায় না। প্রতি বছর বন্যা ঘর নিয়ে যায়। বাঁচাটাই কষ্ট।”
একই বাস্তবতার কথা জানান অন্য বাসিন্দারাও। লবণাক্ততা বেড়ে যাওয়ায় কৃষি জমি নষ্ট হচ্ছে, শামুক–ঝিনুকের মতো প্রাকৃতিক খাবার প্রায় বিলুপ্ত। জীবিকার তাগিদে নদী–বনে নামতে হলেও সেখানেও আর আগের মতো কিছু পাওয়া যায় না।
উৎপত্তি থেকে অস্তিত্ব সংকট,সুন্দরবন আদিবাসী মুন্ডা সংস্থা (সামস)–এর তথ্য অনুযায়ী প্রায় ২৫০ বছর আগে ব্রিটিশদের নির্দেশে রাঁচি থেকে শ্রমিক হিসেবে এনে এই অঞ্চলে বসতি গড়ানো হয় তাদের। বর্তমানে শ্যামনগর ও তালায় রয়েছে ৫০০–৫৫০টি মুন্ডা পরিবার, জনসংখ্যা প্রায় চার হাজার। এদের ৯৫ শতাংশই ভূমিহীন।
গবেষকদের মতে, উপকূলের লবণাক্ততা, ঘন ঘন ঘূর্ণিঝড় এবং কৃষিজমি ধ্বংস—সবকিছু মিলিয়ে এ জনগোষ্ঠী এখন গভীর সংকটে।
কারাম উৎসবসহ হারিয়ে যাচ্ছে ঐতিহ্য,কখনো কারাম উৎসব ছিল তাদের সর্ববৃহৎ সাংস্কৃতিক আয়োজন। কিন্তু আইলা-আম্পানসহ একের পর এক ঘূর্ণিঝড়ে কারামগাছ নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে। উৎসবের মাঠ, বেদি সবই নষ্ট। তাই গত দেড় দশক ধরে আর উৎসব হয় না।
ঐতিহ্যবাহী খাবারও হারিয়ে যাচ্ছে—ইঁদুর, জুংড়া, কচ্ছপ, শামুক, বুনো মাছ এখন আর মেলে না।
সবিতা রানী মুন্ডা বলেন,“আগে আমাদের প্রধান খাবার ছিল ইঁদুর, শামুক, জুংড়া। এখন নোনাপানি—নিষেধাজ্ঞা—কিছুই পাওয়া যায় না। বাধ্য হয়ে বাঙালিদের মতো ভাত–ডাল খেতে হয়।”
বিশেষজ্ঞদের মতে, খাবার হারানো মানে সংস্কৃতির বিলুপ্তি; প্রজন্মান্তরে ঐতিহ্য স্থানান্তর বন্ধ হয়ে যাচ্ছে।ভাষা হারানোর পথে: ‘সাদরি’ এখন শুধু স্মৃতি মুন্ডাদের মাতৃভাষা ‘সাদরি’। কিন্তু স্কুলে বাংলা ছাড়া কোনো ভাষা শেখানোর ব্যবস্থা নেই।
কালিঞ্চি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক ধনঞ্জয় কুমার বৈদ্য বলেন,“সাদরিতে কথা বললে অন্যরা বুঝতে পারে না। তাই শিশুরা বাংলা শেখে। সাদরির জন্য আলাদা শিক্ষক–বই দরকার।”
গবেষক ইদ্রিস আলীর মতে,“ভাষার এই বিবর্তনই বলে দেয় তারা অস্তিত্ব সংকটে আছে।”
সবচেয়ে ঝুঁকিতে নারী–শিশুরা,নারীরা নদীতে হাঁটু–কোমর পানিতে শামুক–জুংড়া তুলতে গিয়ে ত্বক ও স্বাস্থ্য সমস্যায় ভোগেন। নোনাপানি, জলাবদ্ধতা, ভাঙা ঘর এবং স্যানিটেশনের অভাবে শিশুরাও পড়ছে চরম দুর্ভোগে।
জীবিকার নতুন পথ—অল্প কিছু অগ্রগতি,কিছু তরুণ শিক্ষিত হয়ে এনজিও, স্কুল ও সামাজিক কাজে যোগ দিয়েছেন। কেউ করেছেন ছোট ব্যবসা, কেউ গরু–ছাগল পালন শুরু করেছেন। কিছু পরিবার সরকারি সহায়তায় আধাপাকা ঘর পেয়েছে, তবে অধিকাংশেরই ঘর এখনও বাঁশ ও টিনের।
নীতিগত ঘাটতি বড় বাধা, সামস-এর নির্বাহী পরিচালক কৃষ্ণপদ মুন্ডা বলেন,“ঔষধি গাছ–গাছড়া মরে যাওয়ায় ভেষজ চিকিৎসা নেই। ঐতিহ্যবাহী খাবার নেই। কারামগাছও নেই—তাই উৎসবও হারিয়ে গেছে। ভাষা ও সংস্কৃতি টিকিয়ে রাখতে সরকারি উদ্যোগ ছাড়া আর কোনো উপায় নেই।”
সরকারি উদ্যোগের আশ্বাস, সাতক্ষীরা জেলা সমাজসেবা অধিদফতরের উপপরিচালক সায়েদুর রহমান মৃধা জানান—“মুন্ডা জনগোষ্ঠীর সঠিক তথ্যভান্ডার তৈরি করা হবে। খাদ্য, পানি, বাসস্থান, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবায় সমন্বিত উদ্যোগ নেওয়া হবে।”
উপসংহার:সুন্দরবনের প্রান্তিক বাসিন্দা মুন্ডা জনগোষ্ঠী শুধু জলবায়ুজনিত ক্ষয়ক্ষতির শিকার নয়; তারা হারাচ্ছে ভাষা, খাদ্য সংস্কৃতি, ঐতিহ্য এবং সামষ্টিক পরিচয়ও। দ্রুত সমন্বিত নীতি, সরকারি সহায়তা, জীবিকা বৈচিত্র্য এবং সাংস্কৃতিক সংরক্ষণমূলক পদক্ষেপ না নিলে এ সম্প্রদায় ভবিষ্যতে আরও গভীর অস্তিত্ব সংকটে পড়বে।