দেশে জ্বালানি তেলের পর্যাপ্ত মজুত থাকা সত্ত্বেও সাধারণ মানুষের নাভিশ্বাস উঠছে কৃত্রিম সংকটে। সরকারের নানামুখী সাশ্রয়ী নীতি ও উদ্যোগকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে এক শ্রেণির অসাধু ব্যবসায়ী মেতে উঠেছে অবৈধ মজুত ও চুরির মহোৎসবে। ফিলিং স্টেশন থেকে তেল কৌশলে চলে যাচ্ছে কালোবাজারিদের গোপন আস্তানায়, যার ফলে পাম্পে তেল না পেয়ে হাহাকার করছে সাধারণ ভোক্তা ও পরিবহন চালকরা।
সরেজমিনে তদন্তে দেখা গেছে, রাজধানীর বড় বড় ফিলিং স্টেশনগুলোতে ‘তেল নেই’ বলে ফিরিয়ে দেওয়া হলেও অলিগলি কিংবা জেলা শহরের ছোট ছোট দোকানে চড়া দামে মিলছে পেট্রোল ও ডিজেল। অভিযোগ উঠেছে, অসাধু পাম্প মালিকদের সাথে যোগসাজশ করে কালোবাজারিরা ড্রাম ভরে তেল সরিয়ে নিচ্ছে বাসাবাড়ি, গ্যারেজ কিংবা গোপন গুদামে। যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে বৈশ্বিক অস্থিরতাকে পুঁজি করে এই চক্রটি ভবিষ্যতে আরও বেশি মুনাফার আশায় কৃত্রিম সংকট তৈরি করছে।
জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, পরিস্থিতির ভয়াবহতা মোকাবিলায় দেশজুড়ে অভিযান জোরদার করা হয়েছে।
অভিযানের চিত্র একনজরে:
• ৩০ মার্চের বিশেষ অভিযান: একদিনে ৬৪ জেলায় ৩৯১টি অভিযান চালিয়ে ১৯১টি মামলা করা হয়েছে। জব্দ করা হয়েছে ৮৭,৭০০ লিটার অবৈধ তেল।
• মার্চ মাসের সামগ্রিক পরিসংখ্যান: ৩ মার্চ থেকে ২ এপ্রিল পর্যন্ত ৩,৫৫৯টি অভিযানে মোট ১,২৪৪টি মামলা হয়েছে। জরিমানার পরিমাণ ছাড়িয়েছে ৮৪ লাখ ৫১ হাজার টাকা। এই সময়ে ১৯ জনকে কারাদণ্ড এবং প্রায় ৩ লাখ লিটার তেল জব্দ করা হয়েছে।
যুগ্ম সচিব (অপারেশন) মনির হোসেন চৌধুরী জানিয়েছেন, এই পরিসংখ্যানই প্রমাণ করে অবৈধ মজুতের জাল কতটা গভীরে বিস্তৃত।
বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি) চেয়ারম্যান মো. রেজানুর রহমান কঠোর হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেছেন। তিনি জানান, অবৈধ মজুতদারদের তথ্য প্রদানকারীদের জন্য ১ লাখ টাকা পর্যন্ত পুরস্কার ঘোষণা করা হয়েছে। সরকারের মূল লক্ষ্য এখন সরবরাহ চেইন থেকে কালোবাজারিদের হঠানো।
জ্বালানি ও টেকসই উন্নয়ন বিশেষজ্ঞ ড. ইজাজ হোসেনের মতে, এই সংকটের মূলে রয়েছে তদারকির অভাব। তিনি বলেন:
”সরকার যদি পাম্পগুলোতে যথাযথ সরবরাহ বজায় রাখে, তবে সংকট হওয়ার কোনো যৌক্তিক কারণ নেই। পাম্প পর্যায়ে তেল সরবরাহের পর তা কোথায় যাচ্ছে এবং কোনো কারসাজি হচ্ছে কি না, তা আরও গভীরভাবে খতিয়ে দেখা জরুরি।”
সরকার জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিতে ‘হার্ডলাইনে’ থাকলেও মাঠ পর্যায়ের অসাধু সিন্ডিকেট সরকারের সকল ইতিবাচক উদ্যোগকে নস্যাৎ করে দিচ্ছে। সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা, কেবল জেল-জরিমানা নয়, এই সিন্ডিকেটের মূল উৎপাটন করে তেলের স্বাভাবিক সরবরাহ নিশ্চিত করতে প্রশাসন আরও কঠোর ভূমিকা পালন করবে।