মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতা আর যুদ্ধের উত্তাপ এবার সরাসরি আঘাত হেনেছে বাংলাদেশের জ্বালানি বাজারে। বিশ্ববাজারে তেলের অস্থিরতায় দেশে সৃষ্টি হয়েছে তীব্র জ্বালানি সংকট। সরকারের পক্ষ থেকে একে ‘কৃত্রিম সংকট’ দাবি করা হলেও বাস্তব চিত্র ভিন্ন। পাম্পগুলোতে তেলের হাহাকার দেশের প্রধান প্রধান অর্থনৈতিক খাতগুলোকে খাদের কিনারে ঠেলে দিয়েছে। তৈরি পোশাক শিল্প থেকে শুরু করে কৃষি ও মৎস্য খাত—সবখানেই এখন নাভিশ্বাস।
দেশের অর্থনীতির প্রাণশক্তি তৈরি পোশাক খাত এখন গভীর ঝুঁকিতে। অনেক কারখানা চাহিদার অর্ধেক তেলও পাচ্ছে না, ফলে ব্যাহত হচ্ছে উৎপাদন। রপ্তানি আদেশ সময়মতো সরবরাহ করা নিয়ে তৈরি হয়েছে অনিশ্চয়তা।
• বিকেএমইএ-র বক্তব্য: সংগঠনটির সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম জানিয়েছেন, ১৪১টি কারখানার প্রাথমিক তালিকায় দৈনিক ৬২ হাজার লিটার তেলের চাহিদা দেখা গেছে। শিল্প এলাকায় নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহের জন্য সরকারের কাছে তালিকা জমা দিচ্ছে তারা।
উত্তরাঞ্চলসহ সারা দেশে বোরো মৌসুমের সেচ কাজ জ্বালানি তেলের ওপর নির্ভরশীল। কিন্তু বগুড়া ও গাইবান্ধাসহ বিভিন্ন জেলায় পাম্প বন্ধ থাকায় সেচ ব্যবস্থা ভেঙে পড়ার উপক্রম হয়েছে।
• খরচের বোঝা: গাইবান্ধার কৃষকরা জানিয়েছেন, খোলা বাজারে প্রতি লিটার ডিজেল ১৮০ টাকায় কিনতে হচ্ছে।
• ফলন বিপর্যয়: সারের জোগান থাকলেও তেলের অভাবে সেচ দিতে না পারলে এবার বড় ধরনের ফলন বিপর্যয়ের আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা। এতে লোকসানের মুখে পড়ার ভয়ে দিন কাটছে কৃষকদের।জৈালানি সংকটের সরাসরি প্রভাব পড়েছে পণ্য পরিবহনে। পাম্পে তেল না থাকায় সড়কে ট্রাক ও কাভার্ড ভ্যানের সংখ্যা নাটকীয়ভাবে কমে গেছে।
• ভাড়ার চিত্র: চট্টগ্রাম বন্দর থেকে গাজীপুর শিল্প এলাকায় পণ্য পরিবহনের খরচ ২০ হাজার টাকা থেকে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩০ হাজার টাকায়।
• চক্রাকার প্রভাব: পরিবহন খরচ বাড়ায় নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম আরও বাড়ার আশঙ্কা করা হচ্ছে, যা সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রাকে আরও কঠিন করে তুলবে।
জ্বালানি রেশনিংয়ের কবলে পড়ে সমুদ্রগামী বড় জাহাজগুলো মার্চ মাসে মাছ শিকারে যেতে পারেনি।
• বেতন অনিশ্চয়তা: মৎস্যজীবীরা জানিয়েছেন, একটি ট্রিপের জন্য পর্যাপ্ত জ্বালানি না পাওয়ায় তারা বন্দরেই জাহাজ বসিয়ে রাখতে বাধ্য হয়েছেন।
• দ্বিমুখী চাপ: আগামী ১৫ এপ্রিল থেকে সমুদ্রে মাছ ধরায় দুই মাসের নিষেধাজ্ঞা শুরু হচ্ছে। এর আগেই জ্বালানি সংকটে আয় বন্ধ হয়ে যাওয়ায় কয়েক হাজার কর্মকর্তা ও কর্মচারীর বেতন-ভাতা আটকে গেছে।
জ্বালানি তেলের এই সংকট কেবল একটি খাতের সমস্যা নয়, বরং এটি দেশের সামগ্রিক খাদ্য নিরাপত্তা এবং বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের পথকে বাধাগ্রস্ত করছে। দ্রুত কূটনৈতিক ও প্রশাসনিক পদক্ষেপের মাধ্যমে তেলের সরবরাহ স্বাভাবিক করতে না পারলে অর্থনীতি দীর্ঘমেয়াদি মন্দার কবলে পড়তে পারে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা