
ভারতের সংসদীয় রাজনীতির ইতিহাসে পশ্চিমবঙ্গ এক অভাবনীয় এবং নজিরবিহীন সাংবিধানিক অচলাবস্থার সম্মুখীন হতে যাচ্ছে। বিধানসভা নির্বাচনের ফলাফল প্রকাশের পর রাজ্যজুড়ে ছড়িয়ে পড়া রাজনৈতিক সহিংসতা এবং মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের পদত্যাগে অনীহা—এই দুই ঘটনার সংমিশ্রণে আগামী ২৪ ঘণ্টার জন্য রাজ্যে রাষ্ট্রপতি শাসন জারির প্রবল সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। প্রবীণ আইনজ্ঞ ও রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ভারতের ইতিহাসে এর আগে কোনো রাজ্যে এমন পরিস্থিতির উদ্ভব ঘটেনি।গতকালের পর থেকে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে ওঠে যখন ফলাফল পরবর্তী সহিংসতায় বিজেপি নেতার ব্যক্তিগত সহকারীসহ পাঁচজনের মৃত্যুর খবর নিশ্চিত হয়। রাজনৈতিক এই উত্তপ্ত আবহের মধ্যেই মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় পরাজয় মেনে নিতে অস্বীকৃতি জানিয়ে লোকভবনে গিয়ে পদত্যাগ করবেন না বলে সাফ জানিয়ে দিয়েছেন। অথচ সাংবিধানিক নিয়ম অনুযায়ী, আজ ৭ মে বৃহস্পতিবার রাত ১২টা বাজার সঙ্গে সঙ্গেই বর্তমান বিধানসভা ও সরকারের মেয়াদ আনুষ্ঠানিকভাবে শেষ হয়ে যাচ্ছে। সংবিধানের ১৭২ অনুচ্ছেদ অত্যন্ত স্পষ্টভাবে বলছে যে, মেয়াদ উত্তীর্ণ হওয়ার পর বর্তমান সরকারের ক্ষমতায় থাকার কোনো বৈধতা নেই। সাধারণত পরাজয়ের পর বিদায়ী মুখ্যমন্ত্রী রাজ্যপালের কাছে পদত্যাগপত্র জমা দেন এবং নতুন সরকার শপথ না নেওয়া পর্যন্ত কেয়ারটেকার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। তামিলনাড়ুতে এম কে স্ট্যালিন এই ঐতিহ্য বজায় রাখলেও পশ্চিমবঙ্গে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের অনড় অবস্থান এক গভীর আইনি শূন্যতা তৈরি করেছে।এমতাবস্থায় রাজ্যের সাংবিধানিক অভিভাবক হিসেবে রাজ্যপাল বিশেষ পদক্ষেপ নিতে বাধ্য হতে পারেন। যেহেতু বিজেপি আগামী ৯ মে রবীন্দ্র জন্মজয়ন্তীর দিন শপথ গ্রহণের সিদ্ধান্ত নিয়েছে, তাই আজ রাত ১২টার পর থেকে সেই শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠান পর্যন্ত সময়কালটি কোনো নির্বাচিত সরকার ছাড়া অতিবাহিত হওয়া সম্ভব নয়। প্রবীণ আইনজীবী হরিশ সালভে এবং অন্যান্য সংবিধান বিশেষজ্ঞদের মতে, মুখ্যমন্ত্রী স্বেচ্ছায় পদত্যাগ না করলে রাজ্যপাল আজই তাঁর ইস্তফা দাবি করতে পারেন। যদি তাতেও কাজ না হয়, তবে বৃহস্পতিবার(৭মে) ১২টা ১ মিনিট থেকে আগামীকাল শুক্রবার (৮মে) সারাদিন অর্থাৎ নতুন সরকার গঠিত হওয়ার আগের অন্তর্বর্তীকালীন সময়ে রাজ্যে রাষ্ট্রপতি শাসন জারি করা ছাড়া আর কোনো বিকল্প পথ খোলা থাকবে না।রাজ্যের মুখ্য নির্বাচনী আধিকারিক ইতিমধ্য়েই নবনির্বাচিত বিধায়কদের তালিকা সম্বলিত গেজেট নোটিফিকেশন রাজ্যপালের হাতে তুলে দিয়েছেন। এখন বল সম্পূর্ণভাবে রাজভবনের কোর্টে। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় যদি শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত পদত্যাগ না করার সিদ্ধান্তে অনড় থাকেন, তবে পশ্চিমবঙ্গ ভারতের প্রথম রাজ্য হিসেবে শুধুমাত্র একজন বিদায়ী মুখ্যমন্ত্রীর জেদের কারণে এক দিনের জন্য কেন্দ্রীয় শাসনের অধীনে যাওয়ার এক বিতর্কিত এবং ঐতিহাসিক দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে যাচ্ছে। জনমনে এখন একটাই প্রশ্ন, কাল ভোরে পশ্চিমবঙ্গ কোনো নির্বাচিত সরকারের অধীনে জাগবে, নাকি রাইসিনা হিলসের সরাসরি নিয়ন্ত্রণে।