May 21, 2026, 3:24 pm
শিরোনাম :
কচ্ছপিয়ায় ৪০ হাজার ইয়াবাসহ দুইজন আটক প্রতারণা মামলায় নিলয় পারভেজ গ্রেপ্তার, পুলিশের হেফাজতে তদন্ত চলছে ময়মনসিংহ নগরীতে ২২ বোতল বিদেশি মদসহ যুবক আটক ময়মনসিংহে গলাকাটা যুবকের লাশ উদ্ধার, এলাকাজুড়ে চাঞ্চল্য সরাইলে সেপটিক ট্যাংকে নেমে ৪ তরুণের মর্মান্তিক মৃত্যু বিষাক্ত গ্যাসে প্রাণ গেল চার কিশোর-তরুণের, শোকে স্তব্ধ পুরো এলাকা বাংলাদেশের পাসপোর্টে ফিরছে ‘ইসরায়েল ব্যতীত’ শব্দবন্ধ নতুন জলছাপ, নতুন বার্তা ও নতুন পরিচয়ে আসছে ই-পাসপোর্ট ক্ষমতা ও প্রটোকল ভুলে বিশেষ শিশু জিয়াদের পাশে জেলা পরিষদ প্রশাসক সিরাজুল ইসলাম ঝিনাইদহে মানবাধিকার সংস্থার চেয়ারম্যান পরিচয়ে প্রতারণার অভিযোগে আটক তিতাস নদীতে ভেসে ওঠা যুবকের পরিচয় শনাক্ত, ছিনতাইচেষ্টার ঘটনায় মৃত্যু দাবি পুলিশের একটি নৈতিক সংকটে জাতি: প্রতিদিনের দুর্নীতি থেকে বর্বর সহিংসতার পথে

একটি নৈতিক সংকটে জাতি: প্রতিদিনের দুর্নীতি থেকে বর্বর সহিংসতার পথে

Reporter Name

বিচার বিলম্বিত হওয়া মানেই বিচার অস্বীকার করা” কথাটি আমাদের সবারই পরিচিত। কিন্তু বাংলাদেশসহ অনেক দেশের বাস্তবতায় এটি এখন আর শুধু একটি উদ্ধৃতি নয়, বরং মানুষের দীর্ঘদিনের হতাশা, সামাজিক ক্ষত এবং প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতার প্রতিচ্ছবি। সম্প্রতি ঢাকার পল্লবীতে ছোট্ট শিশু রামিসা আক্তারের নির্মম ধর্ষণ ও হত্যাকাণ্ড আবারও পুরো জাতির বিবেককে নাড়িয়ে দিয়েছে। বিভিন্ন প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, পাশের বাসার এক ব্যক্তি শিশুটিকে নৃশংসভাবে ধর্ষণ ও হত্যা করার পর আলামত নষ্ট করারও চেষ্টা করে।

দুঃখজনক হলেও সত্য, এই ঘটনা কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। গত কয়েক বছরে বাংলাদেশে নারী ও শিশুদের বিরুদ্ধে সহিংসতা উদ্বেগজনকভাবে বেড়েছে। প্রায় প্রতিদিনই দেশের কোথাও না কোথাও ধর্ষণ, শিশু নির্যাতন, হত্যা কিংবা নারীর প্রতি পাশবিক আচরণের খবর সামনে আসছে। এসব ঘটনা মানুষের মনে ভয়, ক্ষোভ, হতাশা ও অনিরাপত্তা আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে।

মানবাধিকার সংগঠন ও বিভিন্ন সংবাদমাধ্যম দীর্ঘদিন ধরেই একটি বিষয় তুলে ধরছে, আর সেটি হলো “দায়মুক্তির সংস্কৃতি”। অনেক অপরাধী মনে করে রাজনৈতিক প্রভাব, অর্থনৈতিক ক্ষমতা, দুর্বল তদন্ত, বিচার প্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রতা কিংবা ভুক্তভোগী পরিবারের ওপর চাপ প্রয়োগের মাধ্যমে শেষ পর্যন্ত তারা শাস্তি এড়িয়ে যেতে পারবে। এই বিশ্বাসই সমাজের জন্য সবচেয়ে ভয়ংকর সংকেত।

সম্প্রতি জাতীয় সংসদে উপস্থাপিত তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের অল্প কয়েক মাসেই দেশে শত শত ধর্ষণ ও হত্যার মামলা রেকর্ড হয়েছে। একই সময়ে জাতীয় দৈনিকগুলোতে প্রকাশিত প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে, চলতি বছরের প্রথম চার মাসেই দেশে এক হাজারের বেশি হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়েছে, যার মধ্যে নারী ও শিশুদের সংখ্যা উল্লেখযোগ্য। এই পরিসংখ্যান শুধু অপরাধের ভয়াবহতাই প্রকাশ করে না, বরং এটিও দেখায় যে সমাজ ধীরে ধীরে সহিংসতার প্রতি সংবেদনশীলতা হারিয়ে ফেলছে।

মূল সংকট তাই শুধু পরিসংখ্যানের নয়, এটি সামাজিক মনস্তত্ত্ব ও নৈতিক অবক্ষয়েরও বিষয়। কোনো সমাজ হঠাৎ করে সহিংস হয়ে ওঠে না। দুর্নীতি যখন স্বাভাবিক হয়ে যায়, ক্ষমতার অপব্যবহার যখন শাস্তিহীন থাকে, রাজনৈতিক সন্ত্রাস যখন প্রভাবশালী হয়ে ওঠে, ভূমিদস্যুতা ও চাঁদাবাজি যখন নিয়মে পরিণত হয়, তখন ধীরে ধীরে সমাজ তার নৈতিক প্রতিরোধ ক্ষমতা হারাতে শুরু করে।

আজ অনেকেই পেডোফিলিয়াকে কেবল মানসিক রোগ হিসেবে ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করেন। যদি সেটি সত্য হয়, তাহলে আমাদের এটিও ভাবতে হবে যে দুর্নীতি, সংগঠিত সহিংসতা, রাজনৈতিক সন্ত্রাস, ধর্ষণ সংস্কৃতি, ভূমি দখল, অপরাধীদের রাজনৈতিক আশ্রয় এবং শোষণও কি সামাজিক ও নৈতিক বিকারের অংশ নয়? এসব আচরণ মিলেই একটি অসুস্থ সমাজ তৈরি করে। ভয়াবহ যৌন সহিংসতা কোনো সুস্থ সামাজিক পরিবেশে জন্ম নেয় না। এটি দীর্ঘদিনের নৈতিক ব্যর্থতা, পারিবারিক অবক্ষয়, সামাজিক দায়হীনতা, দুর্বল আইন প্রয়োগ এবং বিকৃত রাজনৈতিক সংস্কৃতির ফল।

আমরা যেন ধীরে ধীরে এমন এক ভয়ংকর চক্রে প্রবেশ করছি, যেখানে দুর্নীতি, লোভ, অন্যায়, সহিংসতা ও ক্ষমতার অপব্যবহার আরও ভয়ংকর অপরাধে রূপ নিচ্ছে। ছোট ছোট অন্যায় যখন সমাজ সহ্য করতে শেখে, তখন একসময় বড় এবং নৃশংস অপরাধের পথও তৈরি হয়ে যায়। নিষ্ঠুরতা কখনো হঠাৎ জন্ম নেয় না, এটি ধীরে ধীরে গড়ে ওঠে।

অবশ্যই বাংলাদেশ একা নয়। বিশ্বজুড়েই নারী ও শিশুদের বিরুদ্ধে সহিংসতা একটি বড় সংকট। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) ও ইউনিসেফসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থা দীর্ঘদিন ধরেই নারী ও শিশুদের ওপর সহিংসতার ক্রমবর্ধমান ঝুঁকির কথা বলে আসছে। তবে উন্নত দেশ ও দুর্বল রাষ্ট্র ব্যবস্থার মধ্যে বড় পার্থক্যটি দেখা যায় রাষ্ট্রীয় প্রতিক্রিয়ায়। যেখানে আইন প্রয়োগ দ্রুত ও কার্যকর, বিচার প্রক্রিয়া স্বচ্ছ, ভুক্তভোগীদের জন্য শক্তিশালী সহায়তা ব্যবস্থা রয়েছে এবং অপরাধীরা সামাজিক ও আইনি কঠোরতার মুখোমুখি হয়, সেখানে মানুষের আস্থা তুলনামূলকভাবে বেশি থাকে। বিপরীতে যেখানে বিচার বিলম্বিত হয়, রাজনৈতিক প্রভাব কাজ করে এবং অপরাধীরা বারবার পার পেয়ে যায়, সেখানে অপরাধপ্রবণতা আরও বাড়ে।

বাংলাদেশে প্রায়ই দেখা যায়, কোনো মর্মান্তিক ঘটনার পর জনরোষ তৈরি হয়, মানববন্ধন হয়, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম সরব হয়ে ওঠে, টেলিভিশন টকশোতে আলোচনা হয়, তারপর ধীরে ধীরে সবকিছু স্তিমিত হয়ে যায়। কিন্তু সমস্যার মূল জায়গাগুলো থেকে যায় অক্ষত। এই বাস্তবতা প্রমাণ করে যে আবেগভিত্তিক প্রতিক্রিয়া দিয়ে কাঠামোগত সামাজিক সংকট মোকাবিলা করা সম্ভব নয়।

আমাদের শিক্ষাব্যবস্থার অন্যতম বড় দুর্বলতা হলো নৈতিক ও মূল্যবোধভিত্তিক শিক্ষার ঘাটতি। আমরা শিশুদের পরীক্ষায় ভালো ফল, পেশাগত প্রতিযোগিতা ও ক্যারিয়ার গঠনের জন্য প্রস্তুত করি, কিন্তু মানবিকতা, সহমর্মিতা, নারীর প্রতি সম্মান, সামাজিক দায়বদ্ধতা, নাগরিক সচেতনতা কিংবা নৈতিক আচরণের বিষয়গুলো এখনো যথেষ্ট গুরুত্ব পায় না। শিশুরা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি শিখছে, কিন্তু মানুষ হিসেবে গড়ে ওঠার শিক্ষাটি অনেক ক্ষেত্রেই দুর্বল থেকে যাচ্ছে।

পরিবার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান, গণমাধ্যম এবং রাজনৈতিক নেতৃত্ব সমাজ গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। যখন শিশুরা দেখে দুর্নীতি পুরস্কৃত হচ্ছে, সহিংসতা স্বাভাবিক হয়ে উঠছে, নারীদের পণ্য হিসেবে উপস্থাপন করা হচ্ছে এবং অপরাধীরা প্রভাবশালী হয়ে উঠছে, তখন ধীরে ধীরে সমাজের নৈতিক ভিত দুর্বল হয়ে পড়ে। তাই নৈতিক শিক্ষা শুধু বইয়ের পাতায় সীমাবদ্ধ থাকলে হবে না, সেটিকে সামাজিক সংস্কৃতির অংশে পরিণত করতে হবে।

গণমাধ্যম ও ডিজিটাল সংস্কৃতির প্রভাবও এখন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অনিয়ন্ত্রিত সহিংস কনটেন্ট, পর্নোগ্রাফি, সাইবার শোষণ, মাদক সংস্কৃতি, অনলাইন জুয়া এবং নারী বিদ্বেষমূলক ডিজিটাল প্রচারণা তরুণ প্রজন্মের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। যথাযথ পারিবারিক নজরদারি, মানসিক স্বাস্থ্য সহায়তা ও ডিজিটাল সচেতনতা ছাড়া এই সংকট আরও জটিল হয়ে উঠতে পারে।

আরেকটি বড় উদ্বেগের বিষয় হলো সাংস্কৃতিক আগ্রাসন। মূলধারার টেলিভিশন, ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অনিয়ন্ত্রিত বিদেশি সংস্কৃতি, অস্বাস্থ্যকর বিনোদন ও নিম্নমানের সাংস্কৃতিক চর্চা আমাদের নিজস্ব সংস্কৃতি, মূল্যবোধ ও সামাজিক ঐতিহ্যকে ধীরে ধীরে দুর্বল করে দিচ্ছে। অশ্লীলতা, অতিরিক্ত বাণিজ্যিকতা, সহিংস বিনোদন ও সামাজিকভাবে অসংবেদনশীল কনটেন্ট তরুণদের মানসিকতা ও সামাজিক আচরণে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। দুঃখজনকভাবে, এসব সাংস্কৃতিক অপচর্চা ও ক্ষতিকর ডিজিটাল প্রভাব নিয়ন্ত্রণে আমাদের কার্যকর ব্যবস্থা এখনও সীমিত। এ ক্ষেত্রে সরকার আরও শক্তিশালী ভূমিকা রাখতে পারে। সুস্থ দেশীয় সংস্কৃতির বিকাশ, পরিবারভিত্তিক বিনোদন, ইতিবাচক গণমাধ্যম চর্চা এবং বাংলাদেশের নিজস্ব সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য সংরক্ষণ ও প্রচারে রাষ্ট্রকে কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে।

এখন সময় এসেছে প্রতীকী বক্তব্যের বাইরে গিয়ে বাস্তব, কার্যকর এবং দৃশ্যমান পদক্ষেপ নেওয়ার। কয়েকটি জরুরি উদ্যোগ বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ:

১. নারী ও শিশু ধর্ষণ-হত্যা মামলার দ্রুত তদন্ত ও দ্রুত বিচার নিশ্চিত করতে হবে।
২. প্রতিটি জেলায় বিশেষায়িত শিশু সুরক্ষা ও ফরেনসিক ইউনিট গড়ে তুলতে হবে।
৩. প্রাথমিক স্তর থেকেই নৈতিকতা, মানবিকতা, নারী-পুরুষের পারস্পরিক সম্মান ও সহিংসতাবিরোধী শিক্ষা বাধ্যতামূলক করতে হবে।
৪. কমিউনিটি পুলিশিং ও স্থানীয় সামাজিক নজরদারি আরও শক্তিশালী করতে হবে।
৫. রাজনৈতিক পরিচয় নির্বিশেষে অপরাধীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে।
৬. তরুণদের জন্য মানসিক স্বাস্থ্য ও কাউন্সেলিং সেবা সম্প্রসারণ করতে হবে।
৭. অনলাইন পর্নোগ্রাফি, শিশু নির্যাতন ও সাইবার অপরাধ দমনে কার্যকর নজরদারি বাড়াতে হবে।
৮. স্কুল, মসজিদ, গণমাধ্যম, সুশীল সমাজ ও স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানকে সম্পৃক্ত করে জাতীয় সচেতনতা কার্যক্রম চালু করতে হবে।
৯. ভুক্তভোগী পরিবার ও সাক্ষীদের নিরাপত্তা এবং আইনি সহায়তা নিশ্চিত করতে হবে।
১০. শিক্ষা, সুশাসন, আইন প্রয়োগ ও সামাজিক জবাবদিহিতাকে কেন্দ্র করে দীর্ঘমেয়াদি জাতীয় নৈতিক পুনর্গঠন কর্মসূচি গ্রহণ করতে হবে।
১১. সুস্থ বাংলাদেশি সাংস্কৃতিক মূল্যবোধ রক্ষায় একটি ভারসাম্যপূর্ণ জাতীয় সাংস্কৃতিক নীতি প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন করতে হবে, যাতে ক্ষতিকর কনটেন্ট নিয়ন্ত্রণ এবং ইতিবাচক দেশীয় সংস্কৃতির বিকাশ নিশ্চিত হয়।

রামিসার মৃত্যু শুধু একটি অপরাধের ঘটনা নয়, এটি পুরো জাতির জন্য একটি সতর্কবার্তা। যে সমাজ তার নারী ও শিশুদের নিরাপত্তা দিতে ব্যর্থ হয়, সেই সমাজ একসময় নিজের মানবিক অস্তিত্বও হারিয়ে ফেলে। তাই শুধু ঘটনার পর বিচার নয়, প্রতিরোধ, নৈতিক পুনর্গঠন, প্রাতিষ্ঠানিক জবাবদিহিতা এবং সামাজিক সংস্কার এখন সময়ের দাবি।

বাংলাদেশ উন্নত রাষ্ট্র হওয়ার স্বপ্ন দেখে। কিন্তু উন্নয়ন শুধু অবকাঠামো, জিডিপি প্রবৃদ্ধি, ফ্লাইওভার কিংবা উঁচু ভবনের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। প্রকৃত উন্নত সমাজ সেই সমাজ, যেখানে শিশুরা নিরাপদ, নারীরা সম্মানিত, বিচারব্যবস্থার প্রতি মানুষের আস্থা রয়েছে এবং মানবিকতা বেঁচে থাকে।

ড. রাহাত শিকদার
আন্তর্জাতিক উন্নয়ন বিশেষজ্ঞ ও কলামিস্ট



ফেসবুক কর্নার