
ফুটবল নিয়ে লিখতে বসলে কখনো কখনো মনে হয়, আমরা আসলে খেলা নিয়ে লিখছি না; লিখছি আমাদের নিজেদের স্মৃতি নিয়ে। একটি গোল, একটি জার্সি, একটি রাত। কত সহজেই সেগুলো মানুষের জীবনের অংশ হয়ে যায়! বিশ্বকাপ এলে এই অনুভূতিটা আরও তীব্র হয়। চার বছর পরপর পৃথিবীর কোটি কোটি মানুষ একই সময়ে একই আবেগে ভেসে যায়। কেউ জেতে, কেউ হারে; কিন্তু শেষ পর্যন্ত সবাই কোনো না কোনো গল্প নিয়ে ঘরে ফেরে।
২০২৬ বিশ্বকাপের ফাইনালেও তাই শুধু স্পেন ও আর্জেন্টিনা নেই। আছে সময়ের দুই প্রান্ত। একদিকে তারুণ্যের উচ্ছ্বাস, অন্যদিকে অভিজ্ঞতার শেষ আলো। আর সেই দুই প্রান্তের মাঝখানে দাঁড়িয়ে আছেন একজন, লিওনেল মেসি।
মেসির নাম উচ্চারণ করলেই ফুটবলের অনেক গল্প একসঙ্গে মনে পড়ে। বার্সেলোনার সেই ছোট্ট জাদুকর, যিনি একের পর এক রেকর্ড ভেঙেছেন; আর্জেন্টিনার সেই অধিনায়ক, যিনি বছরের পর বছর জাতীয় দলের হয়ে সাফল্যের অপেক্ষায় থেকেছেন; আবার সেই মানুষটিও, যিনি একসময় ফাইনালে হেরে কাঁদতে কাঁদতে মাঠ ছেড়েছেন। মেসির ক্যারিয়ার তাই কেবল সাফল্যের গল্প নয়। বরং এটি অপেক্ষার গল্প।
ক্লাব ফুটবলে তার অর্জনের তালিকা এত দীর্ঘ যে সেখানে নতুন কিছু যোগ করার জায়গা প্রায় নেই। কিন্তু জাতীয় দলের হয়ে তার গল্পটি একসময় অসম্পূর্ণ ছিল। ২০১৪ সালের বিশ্বকাপ ফাইনালে জার্মানির কাছে হার, কোপা আমেরিকার ফাইনালে পরাজয়—সব মিলিয়ে মেসির সঙ্গে আর্জেন্টিনার সম্পর্ক যেন বারবার একই প্রশ্নের সামনে দাঁড়াতো। এই মানুষটি কি সত্যিই দেশের হয়ে কিছু জিততে পারবেন?
সমালোচকেরা বলতেন, মেসি যত বড় ক্লাব ফুটবলারই হোন, জাতীয় দলের হয়ে তিনি ম্যারাডোনার সমান নন। সময়ের কী অদ্ভুত বিচার! একসময় যে প্রশ্নটি মেসিকে তাড়া করত, আজ সেটিই ইতিহাসের অংশ।
২০২১ সালে কোপা আমেরিকা জয়, এরপর ২০২২ সালে কাতার বিশ্বকাপ। সেই বিশ্বকাপের ফাইনাল যেন মেসির জীবনের একটি পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র। নাটক ছিল, উত্তেজনা ছিল, পতন ছিল, আবার প্রত্যাবর্তনও ছিল। শেষ পর্যন্ত ট্রফিটি উঠেছিল তার হাতেই। তখন মনে হয়েছিল, এবার বুঝি গল্প শেষ।
কিন্তু মেসির গল্পের সবচেয়ে সুন্দর দিক সম্ভবত এখানেই। তিনি কখনো গল্পের শেষটা নিজের হাতে লেখেননি, সময় তাকে লিখতে দিয়েছে। ২০২৪ সালের জয় এবং এরপর ২০২৬ বিশ্বকাপে আবারও ফাইনালে ওঠা দেখিয়ে দিল, মেসির জন্য হয়তো শেষ শব্দটি এখনো লেখা হয়নি।
তবে এবারের আর্জেন্টিনা অনেক পরিণত। এটি এমন কোনো দল নয়, যেখানে মেসিকে প্রতিটি আক্রমণ তৈরি করতে হবে, প্রতিটি বিপদ সামলাতে হবে, প্রতিটি ম্যাচ একা জিততে হবে। তার পাশে এখন এমন একদল খেলোয়াড় আছে, যারা জানে—মেসি একজন মানুষ, অলৌকিক শক্তির অধিকারী কেউ নন।
ফুটবলে বয়স বাড়লে অনেক কিছু কমে যায়। গতি কমে, দৌড় কমে, শরীরের শক্তি কমে। কিন্তু কিছু জিনিস বয়সের সঙ্গে কমে না; বরং আরও পরিণত হয়। যেমন–একটি ম্যাচ পড়ার ক্ষমতা, সঠিক মুহূর্ত চিনে নেওয়া, একজন সতীর্থকে এমন জায়গায় বল দেওয়া যেখানে সে নিজেও ভাবেনি যে বলটি পৌঁছাতে পারে। মেসির এই ক্ষমতাই তাকে অন্যদের থেকে আলাদা করে।
তিনি হয়তো এখন আর প্রতিপক্ষের পাঁচজনকে পেছনে ফেলে ছুটবেন না। কিন্তু এক মুহূর্তের জন্য প্রতিপক্ষের চোখের দিকে তাকিয়ে খেলার গতি বদলে দিতে পারেন। একটি পাসে পুরো রক্ষণ ভেঙে দিতে পারেন। একটি ফ্রি-কিকে ম্যাচের ভাগ্য বদলে দিতে পারেন।
এবার তার সামনে স্পেন—তরুণ, সাহসী ও গতিশীল। স্পেনের দলে ভবিষ্যতের তারকারা। মেসির সামনে দাঁড়িয়ে আছে এমন একটি প্রজন্ম, যারা ছোটবেলায় হয়তো তার খেলা দেখে বড় হয়েছে। আজ সেই প্রজন্মই তার বিপক্ষে বিশ্বকাপের ফাইনালে। ফুটবল সম্ভবত এর চেয়ে সুন্দর কোনো প্রতীক তৈরি করতে পারে না।
একদিকে এমন একজন, যার ক্যারিয়ারের সূর্য অস্ত যাওয়ার পথে। অন্যদিকে এমন এক প্রজন্ম, যার সূর্যোদয় মাত্র শুরু হয়েছে। তবু মেসিকে নিয়ে মানুষের আগ্রহের কারণ কেবল তার বয়স নয়। কারণ তিনি এমন একজন খেলোয়াড়, যার মাঠে থাকা নিজেই একটি ঘটনা। মেসি বল পেলে দর্শকেরা শুধু অপেক্ষা করেন না, তারা বিশ্বাস করেন, কিছু একটা ঘটতে পারে। এই বিশ্বাসই তার সবচেয়ে বড় উত্তরাধিকার।
বাংলাদেশে মেসির জনপ্রিয়তা নিয়ে আলাদা করে বলার প্রয়োজন নেই। বিশ্বকাপের সময় বাংলাদেশের রাস্তায় আর্জেন্টিনার পতাকা দেখলে মনে হয়, যেন দক্ষিণ আমেরিকার কোনো শহর হঠাৎ আমাদের পাশের গলিতে এসে বসেছে। রাত জেগে খেলা দেখা, ভোরে গোলের আলোচনা, চায়ের দোকানে তর্ক, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে উৎসব—আর্জেন্টিনা এখানে অনেকের কাছে ফুটবল দলের চেয়েও বেশি কিছু। এটি একটি আবেগ, আর সেই আবেগের কেন্দ্রে মেসি।
অনেক বাংলাদেশি মেসিকে দেখে ফুটবল চিনেছেন। তার গোল দেখে আনন্দ করেছেন, তার পরাজয়ে মন খারাপ করেছেন, তার বিশ্বকাপ জয়ে নিজের দলের জয় খুঁজে পেয়েছেন। মেসির সঙ্গে তাদের সম্পর্কের মধ্যে তাই যুক্তির চেয়ে আবেগ বেশি। এই কারণেই ২০২৬ বিশ্বকাপের ফাইনাল হয়তো ফলাফলের বাইরেও একটি বড় প্রশ্নের সামনে দাঁড় করাবে আমাদের, ‘আমরা কি মেসিকে শেষবারের মতো বিশ্বকাপের মঞ্চে দেখছি?’
হয়তো হ্যাঁ, হয়তো না। কিন্তু সত্যি বলতে, মেসির গল্পের সৌন্দর্য তার শেষ ম্যাচে নয়। বরং তার পুরো যাত্রায়। যে মানুষটি একসময় জাতীয় দলের হয়ে কিছু জিততে না পারার জন্য সমালোচিত হয়েছেন, তিনিই পরে বিশ্বকাপ হাতে তুলে নিয়েছেন। যে মানুষটি একসময় হতাশ হয়ে অবসর ঘোষণা করেছিলেন, তিনিই আবার ফিরে এসে ইতিহাস লিখেছেন। তাই মেসির গল্প আমাদের ফুটবলের বাইরেও কিছু শেখায়। তা হলো সব ব্যর্থতা শেষ নয়, সব অপেক্ষা বৃথা নয়, আর কখনো কখনো সবচেয়ে সুন্দর জয়টি আসে সবচেয়ে দীর্ঘ অপেক্ষার পর।
আজকের ফাইনালে আর্জেন্টিনা জিতবে কি না, মেসি গোল করবেন কি না, শেষ পর্যন্ত ট্রফি কার হাতে উঠবে–এসবের উত্তর আমরা খুব শিগগিরই জেনে যাব। কিন্তু একটি সত্যের উত্তর আমরা ইতিমধ্যেই জানি। মেসি ফুটবলকে শুধু খেলেননি; তিনি ফুটবলকে মানুষের অনুভূতির অংশ বানিয়েছেন। তাই এই বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনা যখন মাঠে নামে, তখন শুধু একটি দল মাঠে নামে না। মাঠে নামে একটি ইতিহাস, একটি দেশের স্বপ্ন, একটি প্রজন্মের আবেগ এবং একজন মানুষের দীর্ঘ অপেক্ষার স্মৃতি।
হয়তো এটাই মেসির শেষ বিশ্বকাপ, হয়তো নয়। কিন্তু যতদিন তিনি মাঠে থাকবেন, ততদিন তার প্রতিটি স্পর্শ, প্রতিটি পাস এবং প্রতিটি সম্ভাব্য মুহূর্তকে ঘিরে মানুষের অপেক্ষা থাকবে। মেসি বল পায়ে এগিয়ে এলে গ্যালারি নিঃশব্দ হয়ে যাবে, পৃথিবীর কোটি কোটি মানুষ কয়েক সেকেন্ডের জন্য সবকিছু ভুলে তাকিয়ে থাকবে তার দিকে। কারণ মেসি মাঠে থাকলে ফুটবল কখনো শুধু ফুটবল থাকে না। তা হয়ে ওঠে স্মৃতি, আবেগ এবং অসম্ভবকে সম্ভব হয়ে উঠতে দেখার এক অনন্ত অপেক্ষা।