March 8, 2026, 3:59 am

১৩ বছর আগে ভেঙে পড়া সেতুতে ঝুঁকি নিয়ে স্কুলে শিশুদের যাতায়াত

Reporter Name

অসীম রায় (অশ্বিনী), বান্দরবান:
বুকে বই চেপে ধরে বাড়ি থেকে স্কুলের উদ্দেশ্যে বের হয় রিয়া। বয়স মাত্র আট বছর। প্রতিদিন স্কুলে যেতে তাকে পার হতে হয় বাঁশ ও কাঠের তৈরি একটি ভাঙা ও নড়বড়ে সেতু। রিয়া জানে, এক পা ভুল হলেই সোজা নিচের পাহাড়ি ছড়ায় পড়ে যাওয়ার আশঙ্কা। তবুও স্কুলে যেতেই হবে—কারণ বিকল্প কোনো পথ নেই। এই ঝুঁকিপূর্ণ সাঁকো দিয়েই প্রতিদিন স্কুলে যায় শিশুরা। ভারী ব্যাগ কাঁধে নিয়ে ভয়ে ভয়ে তারা একটার পর একটা বাঁশে পা ফেলে। দূরে দাঁড়িয়ে অভিভাবকেরা তাকিয়ে থাকেন—পা পিছলে গেলে কী হবে, সেই আতঙ্ক বুকে চেপে।
এমন ভয়াবহ দুর্দশাই বান্দরবানের নাইক্ষ্যংছড়ি উপজেলার বাইশারী ইউনিয়নের মানুষের নিত্যদিনের বাস্তবতা। বাইশারী ইউনিয়ন ও কক্সবাজারের রামু উপজেলার গর্জনিয়া ইউনিয়নের মধ্যকার গুরুত্বপূর্ণ সংযোগ সেতুটি ভেঙে পড়ে আজ থেকে প্রায় ১৩ বছর আগে। ২০১২ সালে পাহাড়ি ঢল ও বন্যার পানির তোড়ে গর্জনিয়া উত্তর বড়বিল–দক্ষিণ বাইশারী সংযোগ সেতুটি সম্পূর্ণ ধসে যায়।
সেতু ভেঙে পড়ার পর থেকে মানুষের চলাচল চলছে কাঠ ও বাঁশ দিয়ে তৈরি একটি অস্থায়ী সাঁকোর ওপর দিয়ে। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সেই সাঁকোটিও আরও জীর্ণ ও ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে। সামান্য বৃষ্টি হলেই সাঁকো কেঁপে ওঠে, আর পাহাড়ি ঢল নামলে স্থানীয়দের মনে আতঙ্ক ভর করে—এই বুঝি সব শেষ।
বাইশারী ইউনিয়নের ৭ নম্বর ওয়ার্ডের বাসিন্দা মো. জমির বলেন, “১৩ বছর ধরে একটা ব্রিজ পড়ে আছে—এটা বিশ্বাসই হয় না। আমরা তো মানুষ, আমাদের জীবন কি এতই সস্তা?” তাঁর মতো অনেকেই প্রশ্ন তুলছেন, বছরের পর বছর ধরে এমন ঝুঁকি নিয়ে চলাচল করাটা কি স্বাভাবিক?
২০২৩ সালে সেই আশঙ্কা বাস্তবে রূপ নেয়। সাঁকো থেকে পড়ে গুরুতর আহত হয় এক স্কুলছাত্র। কয়েক দিন তাকে হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে হয়। তবে সেই ঘটনার পরও পরিস্থিতির কোনো দৃশ্যমান পরিবর্তন হয়নি। ঝুঁকি একই রকম রয়ে গেছে।
স্থানীয় কৃষক মো. ইউসুফ বলেন, “আমরা শাকসবজি ফলাই, বাজারে নিয়ে যাই। কিন্তু এই ব্রিজ না থাকায় ফসল নিয়ে যাওয়া আমাদের জন্য বড় কষ্ট। অনেক সময় ফসল নষ্ট হয়ে যায়।” একই কথা বলেন গর্জনিয়া ইউনিয়নের ১ নম্বর ওয়ার্ডের বাসিন্দা মো. সিরাজ। তিনি জানান, শাকসবজি মাথায় করে এই সাঁকো পার হতে হয়। কখনো সাঁকো ভেঙে গেলে কয়েক দিন ঘরবন্দী হয়ে থাকতে হয়, তখন আয়-রোজগার পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায়।
১৯৯৬ সালে নির্মিত এই সেতুটি একসময় দুই ইউনিয়নের মানুষের জন্য যোগাযোগের প্রাণকেন্দ্র ছিল। শিক্ষা, চিকিৎসা, কৃষিপণ্য পরিবহন—সবকিছুর নির্ভরতা ছিল এই সেতুর ওপর। আজ সেই সেতু পড়ে আছে ধ্বংসস্তূপ হয়ে, আর মানুষ বাধ্য হয়ে ঝুঁকি নিয়ে চলাচল করছে।
স্থানীয়রা ইউনিয়ন পরিষদ, উপজেলা প্রশাসন, জেলা পরিষদ, এলজিইডি এবং পার্বত্য চট্টগ্রাম উন্নয়ন বোর্ডসহ বিভিন্ন দপ্তরে একাধিকবার আবেদন করেছেন। কিন্তু দীর্ঘ ১৩ বছরেও সেতুটি পুনর্নির্মাণে কোনো কার্যকর উদ্যোগ দেখা যায়নি। ফলে মানুষের প্রশ্ন—একটি সেতু কি এত বছর ধরে ভাঙা পড়ে থাকতে পারে? দুই জেলার সীমান্তে বসবাস করা এই মানুষগুলোর কি কোনো গুরুত্ব নেই?
বাইশারী ইউনিয়নের ইউপি সদস্য মো. নুরুল কবির বলেন, “আমি জনপ্রতিনিধি হিসেবে লজ্জা পাই। শিক্ষার্থীরাই সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে আছে। অথচ এত বছরে একটা ব্রিজও তৈরি হলো না।” গর্জনিয়া ইউনিয়নের ইউপি সদস্য মো. ফিরোজ আহমদ বলেন, “অনেক কর্মকর্তা এসে দেখে গেছেন, সাংবাদিকেরা লিখেছেন। কিন্তু মানুষ এখন আর আশাও করতে চায় না।”
এ বিষয়ে বাইশারী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মো. আলম জানান, সেতুটি পুনর্নির্মাণের জন্য জেলা পরিষদে আবেদন করা হয়েছে, তবে এখনো কোনো অগ্রগতি হয়নি। অন্যদিকে উপজেলা প্রকৌশলীর বক্তব্যে উঠে আসে প্রশাসনিক জটিলতার বিষয়টি। তিনি জানান, সেতুটি ঠিক কোন উপজেলার আওতাধীন, তা নিয়েই দীর্ঘদিন ধরে অনিশ্চয়তা চলছে।
এদিকে প্রতিদিনই ভাঙা সেতুতে ঝুঁকি নিয়ে স্কুলে যাচ্ছে জয়ীতা, রিয়া ও তাদের মতো অসংখ্য শিশু। তাদের প্রশ্ন একটাই—আর কত দিন এভাবে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে স্কুলে যেতে হবে? দেখার কি সত্যিই কেউ নেই?



ফেসবুক কর্নার