March 8, 2026, 9:04 am

খুলনার শোলমারী নদীর কাঠের সেতু ও টোল আদায় ঘিরে প্রশ্ন নদী ভরাট, জলাবদ্ধতা ও ৪৯ কোটি টাকার প্রকল্প অনুমোদনের অপেক্ষায় ডুমুরিয়া–বটিয়াঘাটা

Reporter Name

 

শেখ রাজু আহমেদ খুলনা

খুলনার বটিয়াঘাটা উপজেলার শোলমারী নদীর ওপর নির্মিত একটি কাঠের সেতু ঘিরে টোল আদায়, ঘাট ইজারা ও অর্থ ব্যবস্থাপনা নিয়ে এলাকায় ব্যাপক প্রশ্ন ও ক্ষোভ তৈরি হয়েছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, সরকারি অনুমোদন ছাড়াই নির্মিত কাঠের সেতুর ওপর দিয়ে নিয়মিত যানবাহন চলাচল করানো হলেও প্রতিদিন টোল আদায় করা হচ্ছে, অথচ সেই অর্থের ব্যবহার ও গন্তব্য সম্পর্কে কোনো স্বচ্ছতা নেই।
জনস্বার্থে নির্মাণ, বিতর্কে রূপ
স্থানীয় সূত্র জানায়, জনসাধারণের চলাচলের সুবিধার্থে নিজ উদ্যোগ ও অর্থায়নে প্রফুল্ল বাবু শোলমারী নদীর ওপর কাঠের সেতুটি নির্মাণ করেন। পরবর্তীতে বিভিন্ন সময়ে স্থানীয় রাজনৈতিক মহলের একটি অংশ সেতুটি নিয়ে বিরোধ সৃষ্টি করে। একপর্যায়ে সেতুটি ভেঙে ফেলার উদ্যোগ নেওয়া হলেও তৎকালীন জেলা প্রশাসক ও বটিয়াঘাটা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সেতুটি ভাঙতে নিষেধ করেন।
এরপর সরকারিভাবে ওই স্থানে নৌকা চলাচলের জন্য ঘাট ইজারা দেওয়া হয়। তবে বাস্তবে নদীর মুখে চর জেগে ওঠায় সেখানে বর্তমানে কোনো নৌকা চলাচল নেই। ফলে সাধারণ মানুষ এখনো প্রফুল্ল বাবুর নির্মিত কাঠের সেতু দিয়েই পারাপার হচ্ছে।
টোল আদায় নিয়ে স্বচ্ছতার অভাব
অভিযোগ রয়েছে, ঘাট ইজারাদাররা এই কাঠের সেতু ব্যবহারকারী যানবাহন থেকে নিয়মিত টোল আদায় করছেন। স্থানীয়দের তথ্যমতে, বর্তমানে—
ভ্যান থেকে ১০ টাকা
প্রাইভেট কার থেকে ৬০ টাকা
ছোট ট্রাক থেকে ১০০ টাকা
টোল আদায় করা হচ্ছে।
এ নিয়ে এলাকাবাসীর প্রশ্ন—সরকার ঘাট ইজারা দিয়ে যে অর্থ আদায় করেছে এবং বর্তমানে যে টোল সংগ্রহ করা হচ্ছে, সেই অর্থ কোন খাতে ব্যয় হচ্ছে—তার কোনো জবাবদিহি নেই।
প্রফুল্ল বাবুর বক্তব্য
প্রফুল্ল বাবু বলেন,
“আমি এই কাঠের সেতুটি সম্পূর্ণ জনস্বার্থে নির্মাণ করেছি। আজও এর যেকোনো মেরামত আমার নিজের অর্থায়নেই করা হচ্ছে। যতদিন সরকার এখানে স্থায়ী সেতু নির্মাণ না করবে, ততদিন এই কাঠের সেতুর যেকোনো সমস্যা আমি নিজ দায়িত্বে ঠিক করে দেব।”
শোলমারী নদী অস্তিত্ব সংকটে
এদিকে শোলমারী নদী বর্তমানে ভয়াবহ অস্তিত্ব সংকটে পড়েছে। প্রায় ৯০ কিলোমিটার দীর্ঘ এই নদীর মোহনায় চর জেগে ওঠায় নৌযান চলাচল প্রায় বন্ধ হয়ে গেছে। অনেক স্থানে নদী হেঁটেই পার হওয়া যাচ্ছে বলে জানিয়েছেন স্থানীয়রা।
খুলনা পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী পলাশ ব্যানার্জী বলেন,
“নদীর মোহনায় অতিরিক্ত পলি জমে মুখ বন্ধ হয়ে গেছে। দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে।”
৪৯ কোটি টাকার প্রকল্প অনুমোদনের অপেক্ষা
ডুমুরিয়া ও বটিয়াঘাটা উপজেলার দীর্ঘদিনের জলাবদ্ধতা নিরসনে ৪৯ কোটি টাকার একটি প্রকল্প বর্তমানে পানি কমিশনের অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে।
‘খুলনা জেলার ডুমুরিয়া ও বটিয়াঘাটা উপজেলায় শোলমারী নদীর সাথে সম্পর্কিত বিল ও আবাসিক এলাকার জলাবদ্ধতা নিরসন’ শীর্ষক প্রকল্পটি আজ পানি কমিশনের সভায় উত্থাপিত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
এর আগে পরিবেশগত প্রভাব মূল্যায়ন (ইআইএ) সনদ না থাকায় পরিকল্পনা কমিশন প্রকল্পটি ফেরত পাঠিয়েছিল। চলতি বছর ইআইএ সম্পন্ন করে পুনরায় প্রকল্পটি পাঠানো হয়েছে।
জলাবদ্ধতায় বিপর্যস্ত ৬ লাখ মানুষ
অতিবৃষ্টিতে গত দুই বছরে ডুমুরিয়া ও ফুলতলা উপজেলায় ছোট-বড় প্রায় ২৪ হাজার মৎস্য ঘের ভেসে গেছে। এতে প্রায় ২৬৫ কোটি টাকার ক্ষতি হয়েছে। ধান ও সবজি চাষে ক্ষতি হয়েছে আরও প্রায় ২০ কোটি টাকা। প্রায় ৬ লাখ মানুষ দীর্ঘদিন ধরে জলাবদ্ধতার কারণে দুর্ভোগে রয়েছে।
প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে লোয়ার শোলমারী নদীর ১২.৫ কিলোমিটার ও আপার শোলমারী নদীর ২.৮ কিলোমিটার খনন, ৯টি খাল পুনঃখনন এবং রেগুলেটরে উচ্চক্ষমতার পাম্প স্থাপনের মাধ্যমে জলাবদ্ধতা নিরসনের সম্ভাবনা রয়েছে।
সংশ্লিষ্টদের আশাবাদ
পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী উজ্জ্বল কুমার সেন বলেন,
“আশা করছি এবার প্রকল্পটির অনুমোদন মিলবে।”
পরিবেশ অধিদপ্তরের পরিচালক (পরিবেশগত ছাড়পত্র) মাসুদ ইকবাল মো. শামীম বলেন,
“ইআইএ সম্পন্ন করে প্রকল্পটি পুনরায় জমা দেওয়া হয়েছে। দ্রুত সমাধান হবে বলে আমরা আশাবাদী।”



ফেসবুক কর্নার