
চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানের পর থেকে রাজনৈতিকভাবে সচেতন দেশের ভোটাররা। এর প্রভাব পড়তে পারে স্থানীয় সরকার নির্বাচনে। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর থেকে আলোচনা শুরু হয়েছে স্থানীয় নির্বাচন নিয়ে। প্রথমেই ঢাকা দক্ষিণ ও উত্তর সিটি করপোরেশন করার প্রস্তুতি রয়েছে বলে জানিয়েছে নির্বাচন কমিশন।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর থেকে আলোচনা শুরু হয়েছে, জামায়াত থেকে কে প্রার্থী হয়ে আসছেন ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশনের নির্বাচনে? বিষয়টি নিয়ে জামায়াতে ইসলামীর পক্ষ থেকে এখন পর্যন্ত কারও নাম ঘোষণা না করা হলেও নিজ উদ্যোগে কাজ শুরু করেছেন জামায়াত ঢাকা মহানগর উত্তরের আমির সেলিমউদ্দীন। তিনি ইসলামী ছাত্র শিবিরের সাবেক সভাপতি ছিলেন। ইতোমধ্যে উত্তর সিটি করপোরেশন এলাকায় বিভিন্ন উন্নয়ন কাজও চালু করে দিয়েছেন তিনি। সিটি করপোরেশন নির্বাচনে জামায়াত থেকে প্রার্থিতা নিশ্চিত না করার পরও এলাকায় পরাজিত হয়ে নিজ উদ্যোগে উন্নয়ন কাজ করাকে অনেকেই স্বাভাবিকভাবে নিচ্ছেন না। জানা গেছে সিলেটের বিভিন্ন স্তরের নেতা ও ব্যবসায়ীদের মাধ্যমে কেন্দ্রে প্রার্থী হিসেবে নিজেকে আলোচনায় রাখার চেষ্টা করছেন তিনি। ঢাকা উত্তর সিটিতে তার এ সম্ভাব্য প্রার্থিতা হওয়া নিয়ে সংগঠনের ভিতরে চলছে নানা আলোচনা-সমালোচনা।
উত্তর সিটির ভোটারদের প্রত্যাশা—জামায়াত এমন একজন প্রার্থী দেবে, যিনি নিম্নবিত্ত থেকে উচ্চবিত্ত পর্যন্ত সবার সঙ্গে সহজে মিশতে সক্ষম। তবে সেলিম উদ্দীনকে উচ্চবিত্ত মহলেই স্যুট-কোট পরে চলাফেরায় বেশি স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করতে দেখা যায়।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সিলেট-৬ আসন থেকে জামায়াতের প্রার্থী হয়েছিলেন সেলিম উদ্দীন। কিন্তু নির্বাচনের মাঠে তাকে প্রচারণায় তেমনভাবে ভোটাররা পাননি। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে যেখানে জামায়াতের প্রার্থীরা ছিলেন সক্রিয়, সেখানে তার উপস্থিতি তেমন লক্ষ্য করা যায়নি। জামায়াতের নেতাকর্মীরা মনে করছেন— যেহেতু অল্প কিছু ভোটে তিনি পরাজিত হয়েছেন, তার উচিত হবে আগামী নির্বাচনের জন্য প্রস্তুতি নিয়ে আসনটিতে দাঁড়িপাল্লাকে জয়ী করা।
ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনে জামায়াতে ইসলামীর ব্যাপক ভোট লক্ষ্য করা যায় ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে। ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনে আসন রয়েছে ঢাকা ১১-১৮ পর্যন্ত। এসব আসনে ত্রয়োদশ নির্বাচনে শুধু জামায়াত দাঁড়িপাল্লা প্রতীকে ভোট পেয়েছে ৩ লাখ ৯৭ হাজার ১৫৪টি। ১১ দলীয় জোট হিসাব করলে এই সংখ্যা দাঁড়ায় ৬ লাখ ৮৮ হাজার ৩৮১টি। অপরদিকে বিএনপি জোট ভোট পেয়েছে ৬ লাখ ৬০ হাজার ৮১৩টি। সংসদ নির্বাচনের হিসাব করলে দেখা যায়, এসব আসনে ২৭ হাজার ৫৬৮ ভোটের ব্যবধানে এগিয়ে আছে ১১ দলীয় জোট। আগামী সিটি করপোরেশন নির্বাচনে জামায়াত যদি ১১ দলীয় জোটের প্রার্থী হিসেবে নিজ দল থেকে কাউকে দেয়, তাহলে তার সম্ভাবনা রয়েছে অনেক।
এক্ষেত্রে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনে জামায়াত ও সাধারণ ভোটাররা মনে করছেন, আসন্ন নির্বাচনে জামায়াতের কেন্দ্রীয় কমিটি যদি প্রার্থী বাছাইয়ে ভুল করে, তাহলে খেসারত দিতে হতে পারে জাতীয় নির্বাচনের মতোই। তাই বিষয়গুলো গুরুত্বসহকারে দেখার দাবি তাদের।
ঢাকা-১৫ আসন দলটির আমির শফিকুর রহমানের। আসনটিতে প্রথমবারের মতো জয়ী হয়েছে জামায়াত। একই সঙ্গে তিনিও প্রথম সংসদ সদস্য হয়েছেন। সেখানকার স্থানীয় একজন ব্যবসায়ী ও ভোটারের সঙ্গে কথা হয় জনকণ্ঠের। তিনি বলেন, নির্বাচিত হয়ে শপথ গ্রহণের পরই জামায়াত আমির নিজেই ঝাড়ু হাতে নেমে পড়েন আমাদের এলাকা পরিষ্কার করতে। বিষয়টি সত্যিই ভালো লেগেছে। তার কাছে জিজ্ঞাসা করা হয়, উত্তর সিটি করপোরেশনে জামায়াত কেমন ভোট পেতে পারে। তার দাবি— জামায়াত যদি তাদের কথা রাখতে পারে, ভোটারদের অধিকার ও নাগরিক অধিকার রক্ষা করতে পারে, তাহলে জনগণ তাদের বেছে নিতে পারে। প্রার্থী হিসেবে আলোচনায় আসে সেলিম উদ্দীনের নাম। তার সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি বলেন, সেদিন জামায়াত আমিরের সঙ্গে তিনিও এই এলাকায় ছিলেন পরিচ্ছন্নতা কর্মসূচিতে, কিন্তু তার গায়ে ছিল স্যুট-কোট। বিষয়টি নজর কেড়েছে আমাদের। ফজরের পরপর যখন সাধারণ পোশাক পরে ভোটারদের কাছে চলে আসছেন জামায়াত আমির, সেখানে তিনি এলিট শ্রেণির প্রতিনিধির মতো এখানে আসেন।
তিনি আরও বলেন, মিরপুরে যারা বসবাস করেন, তাদের অধিকাংশই নিম্ন-মধ্যবিত্ত ও মধ্যবিত্ত। তার দাবি, যারা সাধারণ ভোটারদের কাছে যেতে পারবে, তাদের মতো করে কথা বলতে পারবে, তাদের মতো পোশাক পরতে পারবে, তারাই হতে পারবে জনপ্রতিনিধি। কিন্তু তার মধ্যে এটি লক্ষ্য করা যায়নি।
বিকল্প হিসেবে কাকে চান এই এলাকার বাসিন্দারা— এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, এটা সময় বলে দেবে। তবে এবারের নির্বাচনে শুধু মার্কা দেখে নয়, প্রার্থীর গুণগত মান ও ব্যবহার দেখে ভোট দিয়েছেন ভোটাররা। জামায়াতের উচিত হবে এমন কাউকে বাছাই করা, যার গ্রহণযোগ্যতা রয়েছে। যেহেতু সেলিম উদ্দীন সিলেটের বাসিন্দা এবং নিজ এলাকায় তিনি পরাজিত হয়েছেন, তাই তাকে ছাড়া অন্য কেউ হতে পারে।
সেলিম উদ্দীনের বিষয়ে কথা হয় রাজধানীর উত্তরার একজন জামায়াতের ওয়ার্ড সেক্রেটারির সঙ্গে। নাম প্রকাশ না করার শর্তে তিনি জনকণ্ঠকে বলেন, জামায়াতে ইসলামীর মধ্যে যারা নেতৃত্বে আসছেন, তাদের আমরা সাদরে গ্রহণ করি। তবে আমাদের ওপর যা চাপিয়ে দেওয়া হয়, আমাদের তাই মানতে হয়। ঢাকার ভোটাররা ভাসমান; অধিকাংশই বিভিন্ন অঞ্চল থেকে ঢাকায় এসেছেন। সেলিম উদ্দীন আমাদের উত্তরের আমির হওয়ায় আমরা তাকে চিনলেও এলাকার ভোটাররা তাকে চেনেন না। তিনি যদি এবার সিলেট নির্বাচন না করে ঢাকা উত্তরের কোনো একটি আসনে নির্বাচন করতেন, তাহলে আমাদের জন্য জয়ী হওয়া সহজ হতো। এবারের নির্বাচন প্রতীকে হওয়া না হওয়া নিয়েও অনেক আলোচনা রয়েছে। আমরা দাবি করব, এলাকাভিত্তিক ভোটার ম্যাপিং করে প্রার্থী নির্ধারণ করা। যদি উত্তরা এলাকার কথা বলা হয়, তাহলে এই এলাকার ভোটারদের অধিকাংশই তরুণ; তারা তরুণ কাউকে দেখতে চায়।
তিনি আরও বলেন, সেলিম উদ্দীন ভাই জামায়াতের মধ্যে অবশ্যই ভালো নেতা, তবে মেয়র হিসেবে তাকে সাধারণ জনগণ সহজে গ্রহণ করবে না। কারণ হিসেবে তিনি বলেন— তার মধ্যে একটু এলিট শ্রেণির ভাব লক্ষ্য করা যায় সব সময়। তার একটি ভিডিওর বরাতে তিনি বলেন, এবারের নির্বাচনে আমরা দেখেছি, জামায়াতের বিভিন্ন প্রার্থীরা সাধারণ মানুষের সঙ্গে কিভাবে মিশে গেছেন। কিন্তু তার মধ্যে এটি লক্ষ্য করা যায়নি। তিনি একটি ইলেকশন ক্যাম্পেইনের ভিডিও বানিয়েছেন, সংসদের সামনে হাঁটছেন কোট-স্যুট পরে।
বাড্ডা এলাকার একজন নারী ভোটারের সঙ্গে কথা হলে তিনি জানান, সেলিম উদ্দীনকে চেনেন না। তবে জামায়াত নেতা আতিকুর রহমানকে চেনেন তিনি। তার দাবি, জাতীয় নির্বাচনে পুরো এলাকায় কাজ করেছেন তিনি।
জামায়াতের জ্যেষ্ঠ নেতারা জানান, ঢাকা উত্তরে জামায়াতের সম্ভাব্য প্রার্থী ছিলেন মহানগর উত্তরের আমির সেলিম উদ্দীন। তিনি সিলেট-৬ আসনে পরাজিত হয়েছেন। তাকে সংসদীয় রাজনীতিতেই রাখা হবে। তাই জামায়াত উত্তরে নতুন একজন মেয়র প্রার্থী খুঁজছে। এক্ষেত্রে তরুণ নেতৃত্ব খোঁজা হচ্ছে।