
উত্তরের শান্ত জনপদ ঠাকুরগাঁও। এক সময় যা পরিচিত ছিল আওয়ামী লীগের দুর্গ হিসেবে। কিন্তু ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী সময়ে আওয়ামী লীগের অনুপস্থিতিতে এবারের ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচনে জেলার রাজনৈতিক মানচিত্রে এসেছে বড় পরিবর্তন। তিনটি সংসদীয় আসনেই জয় পেয়েছে বিএনপি। তবে এই ক্লিন সুইপ জয়ের আড়ালেই স্পষ্ট হয়ে উঠেছে নতুন এক রাজনৈতিক সমীকরণ; অভাবনীয় উত্থান ঘটেছে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর।
স্থানীয় ভোটাররা বলছেন, এবারকার নির্বাচন ছিল মূলত আদর্শিক লড়াই। আওয়ামী লীগের অনুপস্থিতিতে বিরোধী রাজনীতির ভেতরেই হয়েছে প্রতিযোগিতা। আগে লড়াই হতো নৌকা আর ধানের শীষে। এবার লড়াই হয়েছে ঘরের মানুষের মধ্যে। তবে জামায়াতের ভোট যে এত বাড়বে, সেটা অনেকেই ভাবেনি বলে মত বালিয়াডাঙ্গির ভোটার মামুন ইসলামের।
জামায়াতের উত্থানের কারণ হিসেবে পীরগঞ্জের প্রবীণ ব্যক্তি শাহ জালাল জুয়েল বলেন, তরুণ প্রজন্মের একটি বড় অংশকে জামায়াত কাছে টানতে পেরেছে।
তবে স্থানীয় রাজনৈতিক বিশ্লেষক নাজমুল হকের মতে, আওয়ামী লীগের শূন্যতায় যে ভোটব্যাংক তৈরি হয়েছে, তার একটি বড় অংশ জামায়াত দখলে নিয়েছে। বিশেষ করে ২ ও ৩ নম্বর আসনে তাদের অবস্থান ভবিষ্যতের জন্য বিএনপির কাছে সতর্কবার্তা।
রাজনৈতিক মহলে আলোচনা রয়েছে ৫ আগস্টের পর কিছু এলাকায় বিএনপির স্থানীয় নেতাদের আচরণ নিয়ে সাধারণ ভোটারদের মধ্যে অসন্তোষ তৈরি হয়। বিভিন্ন স্থানে অরাজকতা ও অভ্যন্তরীণ কোন্দলের অভিযোগও শোনা গেছে। এ কারণগুলো জামায়াতের ভোট বৃদ্ধিতে ভূমিকা রেখেছে বলে মনে করছেন অনেকে। তারা আরও বলছেন, তৃণমূল পর্যায়ে শৃঙ্খলা রক্ষা ও জনসম্পৃক্ততা বাড়াতে না পারলে ভবিষ্যতে বিএনপির এ ক্ষয় আরও প্রকট হতে পারে।
তিনটি আসন বিএনপির দখলে এলেও রাজনৈতিক বোদ্ধাদের মতে, জামায়াতের এ ফল ভবিষ্যতে আসন ভাগাভাগি কিংবা স্থানীয় রাজনীতিতে দরকষাকষির ক্ষেত্রে বড় ভূমিকা রাখবে। আওয়ামী লীগের ভোট কোন দিকে সরে গেছে এবং জামায়াতের ভোট বৃদ্ধির পেছনে কোন কোন ফ্যাক্টর কাজ করেছে, তা নিয়ে বিএনপির অন্দরেও শুরু হয়েছে চুলচেরা বিশ্লেষণ।
ঠাকুরগাঁও-১ (সদর) আসনে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বড় ব্যবধানে জয় পেয়েছেন মূলত তার পরিচ্ছন্ন ভাবমূর্তি এবং জাতীয় রাজনীতিতে তার প্রভাব ও সর্বমহলে গ্রহণযোগ্যতা। এ আসনে মির্জা ফখরুল ২ লাখ ৩৮ হাজার ৮৩৬ ভোট পেয়ে বিজীয় হয়েছেন। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী জামায়াতের দেলাওয়ার হোসেন পেয়েছেন ১ লাখ ৪১ হাজার ১৭ ভোট। জয়ের ব্যবধান ৯৭ হাজার ৮১৯ ভোট।
ভিন্ন চিত্র ঠাকুরগাঁও-২ (বালিয়াডাঙ্গী-হরিপুর) আসনে। এখানে বিএনপি প্রার্থীর জয় এসেছে অনেকটা সুঁইয়ের ছিদ্র দিয়ে। মাত্র ৫ হাজার ৩১০ ভোটের ব্যবধান শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত উৎকণ্ঠা বাড়িয়ে রেখেছিল। জামায়াত-সমর্থিত প্রার্থীর শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বিতা বিএনপির সাংগঠনিক শক্তিকেও চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলে। এ আসনে ধানের শীষের প্রার্থী ডা. আব্দুস সালাম ১ লাখ ২১ হাজার ১৭ ভোট পেয়ে বিজয়ী হয়েছেন। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী মো. আব্দুল হাকিম পেয়েছেন ১ লাখ ১৫ হাজার ৭০৭ ভোট।
ঠাকুরগাঁও-৩ (পীরগঞ্জ-রানীশংকৈল) আসনেও লড়াই ছিল প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ। যদিও শেষ পর্যন্ত বিএনপি প্রার্থী তুলনামূলক বড় ব্যবধান ধরে রাখতে সক্ষম হন। তবু ভোটের অঙ্ক বলছে প্রতিপক্ষের অবস্থান আগের চেয়ে শক্ত হয়েছে। এ আসনে ধানের শীষ প্রতীকে বিএনপির প্রার্থী মো. জাহিদুর রহমান পেয়েছেন ১ লাখ ৩২ হাজার ৭৯৭ ভোট। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী জামায়াত প্রার্থী মো. মিজানুর রহমান দাঁড়িপাল্লা প্রতীকে পেয়েছেন ৯১ হাজার ৯৩৪ ভোট। জয়ের ব্যবধান ৪০ হাজার ৮৬৩ ভোট।