
বর্তমান বিশ্বে ভূ-রাজনীতির সবচেয়ে সংবেদনশীল স্নায়ুকেন্দ্রগুলোর একটি হলো মধ্যপ্রাচ্যের হরমুজ প্রণালী। প্রতিদিন প্রায় ২০ থেকে ২১ মিলিয়ন ব্যারেল তেল এই সরু সমুদ্রপথ দিয়ে পরিবাহিত হয়, যা বৈশ্বিক জ্বালানি চাহিদার প্রায় এক-পঞ্চমাংশ। ফলে এই অঞ্চলে সামান্য উত্তেজনাও পুরো বিশ্ব অর্থনীতিকে অনিশ্চয়তার মুখে ঠেলে দিতে পারে।
সাম্প্রতিক সময়ে মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে বাড়তে থাকা রাজনৈতিক ও সামরিক উত্তেজনা হরমুজ প্রণালীকে ঘিরে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে। অনেকের মনে প্রশ্ন জাগে—যদি এই পথ বন্ধ হয়ে যায়, তাহলে কি পাইপলাইন বিকল্প হিসেবে কাজ করতে পারে? বাস্তবতা হলো, বিকল্প ব্যবস্থা থাকলেও তা মোট চাহিদার তুলনায় খুবই সীমিত।
বর্তমানে সৌদি আরবের ‘ইস্ট-ওয়েস্ট পাইপলাইন’ এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতের ‘আবুধাবি-ফুজাইরা পাইপলাইন’ মিলিয়ে বিকল্প পরিবহন সক্ষমতা প্রায় ৬ থেকে ৭ মিলিয়ন ব্যারেল। অথচ হরমুজ প্রণালী দিয়ে প্রতিদিন ২০ মিলিয়নের বেশি ব্যারেল তেল পরিবাহিত হয়। অর্থাৎ প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ তেল এখনও এই ঝুঁকিপূর্ণ সমুদ্রপথের ওপর নির্ভরশীল। ফলে কোনো কারণে এই পথ বন্ধ হয়ে গেলে বিশ্ববাজারে তেলের সরবরাহে বড় ধরনের সংকট দেখা দিতে পারে।
এই পরিস্থিতির অর্থনৈতিক সমীকরণটিও বেশ জটিল। তেলের দাম বাড়লে রপ্তানিকারক দেশগুলো—বিশেষ করে সৌদি আরব ও ওমান—আর্থিকভাবে লাভবান হয়। এমনকি আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞায় থাকা ইরানও পরোক্ষভাবে কৌশলগত সুবিধা পেতে পারে। সরবরাহ ঘাটতি তৈরি হলে অনেক দেশ বাধ্য হয়ে বিকল্প উৎস হিসেবে ইরানের তেলের দিকে ঝুঁকতে পারে।
অন্যদিকে বাংলাদেশ, ভারত, চীন ও জাপানের মতো আমদানিনির্ভর দেশগুলোর জন্য পরিস্থিতি সম্পূর্ণ ভিন্ন। তেলের দাম বাড়লে পরিবহন ব্যয় থেকে শুরু করে উৎপাদন খরচ এবং নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম দ্রুত বেড়ে যায়। এর সরাসরি প্রভাব পড়ে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয়ের ওপর।
বিশ্লেষকদের মতে, হরমুজ প্রণালীকে কেন্দ্র করে বর্তমান উত্তেজনা কেবল জ্বালানি সরবরাহের প্রশ্ন নয়; এটি বৈশ্বিক শক্তির রাজনীতিরও একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। যুক্তরাষ্ট্রের নীতিনির্ধারণ, ইসরায়েলের আঞ্চলিক নিরাপত্তা কৌশল এবং মধ্যপ্রাচ্যের শক্তির ভারসাম্য—সবকিছুই এই গুরুত্বপূর্ণ চোকপয়েন্টকে ঘিরে আবর্তিত হয়।
সব মিলিয়ে বলা যায়, পাইপলাইন ব্যবস্থার মাধ্যমে সর্বোচ্চ ২৫ থেকে ৩০ শতাংশ বিকল্প সরবরাহ নিশ্চিত করা সম্ভব হলেও হরমুজ প্রণালী এখনও বিশ্বের জ্বালানি নিরাপত্তার প্রধান ধমনী। এই ধমনীতে সামান্য অস্থিরতাও বৈশ্বিক অর্থনীতিতে বড় ধরনের প্রভাব ফেলতে পারে।
আন্তর্জাতিক মহল যদি দ্রুত একটি টেকসই রাজনৈতিক সমাধানে পৌঁছাতে না পারে, তবে তেলের মূল্যবৃদ্ধির চাপ উন্নয়নশীল দেশগুলোর অর্থনীতির ওপর গুরুতর প্রভাব ফেলতে পারে।