
গতকাল সকাল ৬টা ৪০ মিনিট। কুড়িগ্রামের রৌমারী উপজেলার গয়টাপাড়া সীমান্তের ১০৬০/১-এস নম্বর পিলারের শূন্য রেখা। ঠিক এই বিন্দুতে এসে যেন থমকে গেছে মানবতার সমস্ত ব্যাকরণ। ভারত থেকে কথিত পুশইনের শিকার হয়ে একটি পরিবার, যার মধ্যে রয়েছে এক নিষ্পাপ শিশু, খোলা আকাশের নিচে মানবেতর জীবনযাপন করছে। নেই মাথার ওপর নিরাপদ আশ্রয়, নেই খাদ্যের নিশ্চয়তা, নেই বিশুদ্ধ পানি কিংবা প্রয়োজনীয় চিকিৎসাসেবা। চারপাশে শুধু অনিশ্চয়তা, আতঙ্ক এবং অজানা ভবিষ্যতের এক দীর্ঘ কালো ছায়া।
এই দৃশ্য কেবল একটি পরিবারের অসহায়ত্বের প্রতিচ্ছবি নয়; এটি আমাদের আধুনিক সভ্যতার জন্যও এক কঠিন প্রশ্ন। একটি শিশুর অপরাধ কী? জন্মের পর থেকে তার প্রাপ্য ছিল নিরাপত্তা, ভালোবাসা, শিক্ষা এবং মর্যাদাপূর্ণ পরিবেশে বেড়ে ওঠার অধিকার। অথচ বাস্তবতার নির্মম পরিহাসে, রাজনীতির মারপ্যাঁচ আর সীমান্তের কাঁটাতারের মাঝে সেই নিষ্পাপ শৈশব আজ অবরুদ্ধ।
ক্ষুধার্ত ও আতঙ্কিত চোখে শিশুটি হয়তো চারপাশের পরিস্থিতি বোঝার চেষ্টা করছে। কিন্তু তার এই নীরব আর্তি শোনার মতো সংবেদনশীলতা কি আমাদের রাষ্ট্রযন্ত্র কিংবা আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের আছে? সীমান্তের উত্তেজনাপূর্ণ পরিস্থিতির মধ্যে পরিবারটির প্রতিটি মুহূর্ত কাটছে চরম অনিশ্চয়তা ও বেঁচে থাকার লড়াইয়ে। সেখানে মানবাধিকারের বড় বড় বাণী শূন্য রেখায় এসে যেন মুখ থুবড়ে পড়ে।
রাষ্ট্রীয় সীমানা, কাঁটাতারের বেড়া কিংবা আইনি জটিলতার ঊর্ধ্বে মানুষের জীবন ও মর্যাদা সর্বাগ্রে বিবেচ্য হওয়া উচিত। কোনো শিশুই কোনো ভৌগোলিক বা রাজনৈতিক পরিস্থিতির বলি হতে পারে না। এই সংকট শুধু দুটি দেশের সীমান্ত ব্যবস্থাপনার বিষয় নয়; এটি আমাদের সম্মিলিত মানবিক মূল্যবোধ ও বিবেকের কাছেও এক বড় প্রশ্নচিহ্ন।
আজ যদি আমরা একটি শিশুর মৌলিক অধিকার ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ব্যর্থ হই, তবে বিশ্বমঞ্চে মানবাধিকারের যেকোনো স্লোগানই অর্থহীন হয়ে পড়বে। তাই মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে এখনই প্রয়োজন সংশ্লিষ্ট সকল পক্ষের দ্রুত ও কার্যকর পদক্ষেপ। আইনি বা কূটনৈতিক জটিলতা যাই থাকুক না কেন, সর্বপ্রথম অগ্রাধিকার হওয়া উচিত ওই শিশু ও তার পরিবারের নিরাপত্তা, মর্যাদা এবং মৌলিক চাহিদা নিশ্চিত করা।
জরুরি ভিত্তিতে তাদের খাদ্য, বিশুদ্ধ পানি ও চিকিৎসাসেবা প্রদান সময়ের দাবি। কোনো শিশুই যেন সীমান্ত পরিস্থিতির নির্মম শিকার না হয়, কোনো শৈশব যেন আতঙ্ক ও অনিশ্চয়তার কাঁটাতারে ঝুলে না থাকে—এটাই হোক আমাদের সম্মিলিত প্রত্যাশা।
আন্তর্জাতিক মানবাধিকার ও শিশু অধিকার সনদের প্রতি শ্রদ্ধা রেখে, এই সংকটের একটি দ্রুত, মানবিক ও স্থায়ী সমাধান কামনা করছি। পৃথিবী শিশুদের জন্য নিরাপদ হোক; সীমান্ত যেন তাদের হাসিমুখ কেড়ে না নেয়।