
নিজস্ব প্রতিবেদক, মণিরামপুর (যশোর)
মণিরামপুরের কাটাখালি হাজরাইল নলঘোনা (কেএইচএন) মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক এম এ মান্নানের বিরুদ্ধে দীর্ঘদিন ধরে শিক্ষানীতি বহির্ভূত কর্মকাণ্ড, রাজনৈতিক সম্পৃক্ততা, নিয়োগ বাণিজ্য, অনিয়ম ও অনৈতিক আচরণের গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। গত বৃহস্পতিবার (২০ নভেম্বর) বিদ্যালয়ের বার্ষিক পরীক্ষা চলাকালে প্রধান শিক্ষককে বিদ্যালয়ে অনুপস্থিত অবস্থায় পাওয়া গেলে এসব অভিযোগ নতুন করে আলোচনায় আসে।
বিদ্যালয়টি ১৯৯৪ সালে প্রতিষ্ঠিত। বৃহস্পতিবার সকাল ৯টায় তিনতলা ভবনে বার্ষিক পরীক্ষা চলছিল; সহকারী শিক্ষক, কেরানী, দপ্তরি ও আয়া সবাই দায়িত্ব পালন করলেও প্রধান শিক্ষকের কক্ষ তখন শূন্য পড়ে ছিল। শিক্ষকদের একজন জানান—প্রধান শিক্ষক নাকি “গুরুত্বপূর্ণ কাজে” মণিরামপুরে গেছেন। কিন্তু উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসার ফোনে স্পষ্ট করেন, সেদিন তাঁর অফিসে কোনো ধরনের উপস্থিতির প্রয়োজনীয়তা ছিল না। অনুসন্ধানে জানা যায়—প্রধান শিক্ষক মান্নান একটি বেসরকারি এনজিও ‘হাঙ্গার প্রজেক্ট’-এর অনুষ্ঠানে পৌরসভা হলরুমে দায়িত্ব পালন করছিলেন।
অভিযোগের বিস্তৃত চিত্র
বিদ্যালয়ের একাধিক শিক্ষক, কর্মচারী ও স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, এম এ মান্নান প্রাতিষ্ঠানিক দায়িত্বে অত্যন্ত উদাসীন। অভিযোগ রয়েছে—
ইচ্ছেমতো বিদ্যালয়ে আসা-যাওয়া
প্রধান শিক্ষকের চেয়ারে বসে হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসা দেওয়া
নিয়োগ বাণিজ্য ও স্বজনপ্রীতি
এক শিক্ষিকার সঙ্গে অনৈতিক সম্পর্কের অভিযোগ
শিক্ষাপেশার বাইরে বিভিন্ন এনজিওতে অতিরিক্ত সম্পৃক্ততা
প্রকাশ্যে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণ
বিগত জাতীয় নির্বাচনে প্রকাশ্যে “ভোট কর্তন”
এ ছাড়া ২৪ নভেম্বর সোমবার বার্ষিক পরীক্ষা চলাকালেও তিনি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের অনুমতি ছাড়াই রাজধানীতে একটি অনুষ্ঠানে যোগ দেন। কখনো জাতীয় পার্টি, কখনো বিএনপি, আবার কখনো আওয়ামী লীগের কর্মসূচিতে প্রধান শিক্ষকের সক্রিয় উপস্থিতির অভিযোগ বহু আগে থেকেই প্রচলিত।
স্থানীয়দের দাবি: ক্ষমতার প্রভাব ব্যবহার করে বহাল তবিয়তে
তদন্তের শুরুতে এক ইজিবাইক চালকের সহযোগিতায় সংগৃহীত গোপন ভিডিওতে দেখা যায়—চালক নিজেকে মান্নানের কর্মকাণ্ডের ভুক্তভোগী দাবি করছেন এবং তাঁর বিরুদ্ধে একাধিক অভিযোগের সত্যতা তুলে ধরছেন।
স্থানীয়দের দাবি—বিগত সরকারের আমলে প্রভাবশালী আওয়ামী লীগ নেতাদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা গড়ে তোলেন মান্নান। সাবেক প্রতিমন্ত্রী স্বপন ভট্টাচার্য, উপজেলা আওয়ামী লীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক প্রভাষক ফারুখ হোসেন এবং অন্যান্য নেতার সঙ্গে তাঁর ঘনিষ্ঠ যোগাযোগের কথাও তরজা রয়েছে। এ সম্পর্কের সুবিধা নিয়ে তিনি ক্ষমতার অপব্যবহারে ধীরে ধীরে একটি প্রভাববলয় তৈরি করেন।
অভিযোগ আছে—এই সময়ে মান্নান কাটাখালিতে রাজকীয় বাড়ি নির্মাণসহ মণিরামপুর পৌরসভার দুর্গাপুর এলাকায় উল্লেখযোগ্য পরিমাণ জমি কেনেন।
নিয়োগ বাণিজ্যের অভিযোগ
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক ভুক্তভোগী জানান—তৃতীয় শ্রেণির একটি নিয়োগের সময় তাঁকে “মোটা অঙ্কের টাকা” দিতে বাধ্য করা হয়। এমনকি একটি বদ্ধ কক্ষে নিয়ে ফাঁকা স্ট্যাম্পে স্বাক্ষর নেওয়ার অভিযোগও করেন তিনি। পরে জনমতের চাপে ঐ নিয়োগ বাতিল না করে তাঁকে বহাল রাখা হয়।
অভিযুক্তের প্রতিক্রিয়া
অভিযোগের বিষয়ে প্রধান শিক্ষক এম এ মান্নানের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন,
“তুমি নিউজ করতে পারো। তবে নিউজে আমার প্রতিষ্ঠানের রাস্তা সংস্কারের বিষয়টি একটু তুলে দিও। প্রতিষ্ঠানটির শিক্ষার মান ভালো। মোটামুটি একটা পজিটিভ নিউজ করলেই হয়। আমি তো একজন সম্মানীয় ব্যক্তি।”
প্রশাসনের অবস্থান
সার্বিক বিষয়ে অবগত হয়ে মণিরামপুর উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসার মোঃ জিল্লুর রশীদ বলেন,
“আমরা প্রাথমিকভাবে তাঁকে শোকজ করব। পরে তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।”