April 23, 2026, 10:23 pm
শিরোনাম :
ধামইরহাটে পুলিশের অভিযানে ৬৫০০ লিটার চোলাই মদ উদ্ধার ও ধ্বংস কালিগঞ্জের ডিআরএম কলেজের অধ্যক্ষ আবুল বাশার বরখাস্ত শান্তিগঞ্জে জাতীয় পুষ্টি সপ্তাহ উদ্বোধন, সপ্তাহজুড়ে সচেতনতা কর্মসূচি তীব্র গরমে অভিভাবকদের পাশে দাঁড়ালেন ভাইস চেয়ারম্যান প্রার্থী শাহীন মাহমুদ ডাক্তার হওয়ার স্বপ্নে এগিয়ে চলা তাপস্বীর পাশে জেলা পরিষদ বাগমারায় ৭ মাসের শিশুকে নিয়ে নিখোঁজ গৃহবধূ, উৎকণ্ঠায় পরিবার শিবগঞ্জে টানা চুরির ঘটনায় আতঙ্ক, চার দিনে ১৩ বাড়িতে সিঁধ কাটা মান্দায় জমি বিরোধে সাত বিঘার বোরো ধান কেটে নেওয়ার অভিযোগ ব্যবসা নিয়ে সংঘর্ষ মামলায় এনায়েতনগর যুবদলের তিন নেতা জামিনে মুক্তির পথে সিংগাইরে নারীর মরদেহ উদ্ধার, রহস্য উদঘাটনে ময়নাতদন্তের অপেক্ষায় পুলিশ

মানবিকতার আড়ালে অপরাধের নেটওয়ার্ক: ‘ভিক্ষা’ যখন সুসংগঠিত লাভজনক ব্যবসা

অতনু বিশ্বাস

ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন শহরে এক সময় মানুষের চরম অসহায়ত্বের শেষ অবলম্বন ছিল ভিক্ষা। নদীভাঙনে সর্বস্বান্ত মানুষ, অন্ধ, পঙ্গু বা নিঃস্ব বিধবারা কেবল দু’মুঠো অন্নের আশায় মানুষের দ্বারে হাত পাততেন। কিন্তু সময়ের পরিবর্তনে সেই চিত্রে এসেছে ভয়াবহ রূপান্তর। এখন ‘ভিক্ষা’ অনেক ক্ষেত্রেই আর নিছক অভাবের প্রকাশ নয়—বরং এটি একটি সুসংগঠিত, পরিকল্পিত এবং উচ্চ মুনাফাভিত্তিক নেটওয়ার্কে পরিণত হয়েছে।
রাজধানী ঢাকা ও অন্যান্য বড় শহরের অলিগলি, বাস-ট্রেন, ট্রাফিক সিগন্যাল এবং ধর্মীয় উপাসনালয়ের সামনে প্রতিদিন দেখা মিলছে পেশাদার ভিক্ষুকদের। অনুসন্ধানে উঠে এসেছে—এদের একটি বড় অংশ প্রকৃতপক্ষে চরম অভাবগ্রস্ত নয়। অনেকেই সুঠামদেহী, কর্মক্ষম; কেউ কৃত্রিমভাবে পঙ্গুত্বের অভিনয় করছেন, কেউ ভুয়া চিকিৎসাপত্র দেখিয়ে অসুস্থতার গল্প শোনাচ্ছেন। মানবিকতাকে পুঁজি করে সহানুভূতি আদায়ই তাদের প্রধান কৌশল।
কেউ টাকা দিতে অস্বীকৃতি জানালে উগ্র অঙ্গভঙ্গি, বিরক্তিকর আচরণ কিংবা মানসিক চাপ প্রয়োগের ঘটনাও নিত্যদিনের। অনেকেই এটিকে সূক্ষ্ম ধরনের চাঁদাবাজির সঙ্গে তুলনা করছেন। সামাজিক বিশ্লেষকদের মতে, “যেখানে সহমর্মিতা থাকার কথা, সেখানে কৌশলী প্রতারণা সমাজে আস্থার সংকট তৈরি করছে।”
শক্তিশালী সিন্ডিকেটের অভিযোগ
সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো—বড় শহরগুলোতে এই ভিক্ষাবৃত্তির পেছনে সক্রিয় রয়েছে শক্তিশালী সিন্ডিকেট বা চক্র। অভিযোগ রয়েছে, শহরের গুরুত্বপূর্ণ মোড় বা সিগন্যালভিত্তিক এলাকা ভাগ করে দেওয়া হয়। প্রতিদিন নির্দিষ্ট যানবাহনে করে ভিক্ষুকদের নামিয়ে দেওয়া হয় এবং দিনশেষে সংগৃহীত অর্থের একটি বড় অংশ চলে যায় নিয়ন্ত্রকদের হাতে।
মানবাধিকারকর্মীদের বরাত দিয়ে জানা যায়, অতীতে বিভিন্ন সময় শিশুদের অপহরণ, অঙ্গহানি বা জোরপূর্বক ভিক্ষায় নামানোর অভিযোগও সামনে এসেছে। তবে এসব অভিযোগের সত্যতা যাচাই ও প্রমাণের দায়িত্ব সংশ্লিষ্ট আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর। বিশেষজ্ঞদের মতে, যদি এমন অপরাধ ঘটে থাকে, তবে তা নিঃসন্দেহে সংগঠিত অপরাধের শামিল এবং কঠোর তদন্ত প্রয়োজন।
এছাড়া, অনেক সময় দেখা যায় শিশুদের কোলে নিয়ে নারীরা ভিক্ষা করছেন। অভিযোগ রয়েছে, কিছু ক্ষেত্রে শিশুদের ঘুমের ওষুধ খাইয়ে নিস্তেজ করে রাখা হয় যাতে পথচারীদের সহানুভূতি সহজে পাওয়া যায়। বিষয়টি নিয়ে সামাজিক মাধ্যমে বিভিন্ন প্রতিবেদন থাকলেও প্রতিটি ঘটনার স্বাধীন তদন্ত অপরিহার্য।
প্রকৃত অভাবীরা উপেক্ষিত
এই পরিস্থিতির সবচেয়ে বড় শিকার প্রকৃত অসহায় মানুষরা। বার্ধক্য, প্রতিবন্ধকতা বা দীর্ঘস্থায়ী অসুস্থতার কারণে যারা সত্যিই কাজ করতে অক্ষম, তারা পেশাদারদের ভিড়ে হারিয়ে যাচ্ছেন। সাধারণ মানুষের মধ্যে তৈরি হয়েছে অবিশ্বাস—কে প্রকৃত অভাবী, আর কে পেশাদার—তা বোঝা কঠিন হয়ে পড়েছে।
ফলে যাকাত, সদকা বা দান অনেক সময় প্রকৃত প্রাপকের কাছে না পৌঁছে চলে যাচ্ছে একটি সম্ভাব্য সিন্ডিকেটের হাতে। সমাজবিজ্ঞানীরা বলছেন, “অনিয়ন্ত্রিত দানশীলতা কখনো কখনো অনিচ্ছাকৃতভাবে অপরাধচক্রকে টিকিয়ে রাখতে সহায়তা করতে পারে।”
করণীয় কী?
বিশেষজ্ঞদের মতে, কেবল আইন প্রয়োগই যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন সামাজিক সচেতনতা ও পরিকল্পিত পদক্ষেপ।
রাস্তায় যাকে-তাকে অর্থ না দিয়ে স্থানীয়ভাবে পরিচিত অভাবী পরিবারকে নিয়মিত সহায়তা করা যেতে পারে।
সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগে প্রকৃত ভিক্ষুকদের তালিকা তৈরি ও পুনর্বাসন কার্যক্রম জোরদার করা জরুরি।
শিশুদের ব্যবহার বা জোরপূর্বক ভিক্ষায় নিয়োজিত করার অভিযোগের ক্ষেত্রে কঠোর তদন্ত ও আইনগত ব্যবস্থা প্রয়োজন।
নাগরিকদের উচিত মানবিকতা বজায় রাখা, তবে সচেতন ও দায়িত্বশীল উপায়ে সহায়তা করা।
সমাজে মানবিকতার চর্চা যেন প্রতারণার হাতিয়ার না হয়—এটাই এখন সময়ের দাবি। প্রকৃত অভাবীদের মর্যাদা রক্ষা ও অপরাধচক্র নির্মূলে রাষ্ট্র ও সমাজকে সমন্বিতভাবে এগিয়ে আসতে হবে।



ফেসবুক কর্নার