হরমুজ প্রণালি: বিশ্ব অর্থনীতির ধমনীতে ইরানের সতর্কবার্তা
কে. এম. জাকির রৌমারী (কুড়িগ্রাম) প্রতিনিধি
Update Time :
Saturday, March 7, 2026
/
24 Time View
/
Share
মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনীতিতে ‘হরমুজ প্রণালি’ বরাবরই একটি আগ্নেয়গিরির মতো, যা যেকোনো সময় অগ্নুৎপাত ঘটিয়ে বিশ্ব ব্যবস্থাকে ওলটপালট করে দিতে পারে। সম্প্রতি ইরান এই প্রণালিটি নিয়ে নতুন এক ঘোষণা দিয়েছে, যা একদিকে যেমন কিছুটা স্বস্তিদায়ক, অন্যদিকে চরম উদ্বেগজনক। তেহরান জানিয়েছে, তারা এখনই এই কৌশলগত জলপথটি বন্ধ করছে না; তবে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলি সংশ্লিষ্টতা থাকা জাহাজের ওপর হামলার যে হুঁশিয়ারি তারা দিয়েছে, তা বিশ্ব অর্থনীতি ও নিরাপত্তার জন্য এক নতুন অশনিসংকেত।
বিশ্ব অর্থনীতির জীবনরেখা
পারস্য উপসাগর ও ওমান উপসাগরের মধ্যবর্তী এই সরু জলপথটি বিশ্বের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ‘অয়েল ট্রানজিট পয়েন্ট’। পরিসংখ্যান বলছে, প্রতিদিন বিশ্ববাজারে আসা মোট জ্বালানি তেলের প্রায় ২০ শতাংশ বা এক-পঞ্চমাংশ এই পথ দিয়েই পার হয়। সৌদি আরব, ইরাক, কুয়েত এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতের মতো বড় তেল রপ্তানিকারক দেশগুলো এই পথের ওপর নির্ভরশীল। ইরান যদি সরাসরি প্রণালি বন্ধ নাও করে, কেবল হামলার হুমকির কারণেও বিশ্ববাজারে তেলের সরবরাহ ব্যাহত হতে পারে। আর তেলের দাম বাড়া মানেই হলো—পরিবহন খরচ বৃদ্ধি থেকে শুরু করে প্রতিটি নিত্যপণ্যের দাম সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে চলে যাওয়া।
ইরানের রণকৌশল: ‘খোলা পথে মরণফাঁদ’
ইরানের বর্তমান অবস্থানটি বেশ চাতুর্যপূর্ণ। তারা প্রণালিটি বন্ধ করে বিশ্বজুড়ে নিজেদেরকে একঘরে করতে চায় না, কারণ এতে চীন বা ভারতের মতো বন্ধুপ্রতিম দেশগুলোও ক্ষতিগ্রস্ত হবে। তার বদলে তারা বেছে নিয়েছে ‘টার্গেটেড অ্যাটাক’ বা লক্ষ্যভেদী হামলার পথ। বিশেষ করে লোহিত সাগরে হুতি বিদ্রোহীদের কর্মকাণ্ডের পর ইরানের এই সরাসরি হুঁশিয়ারি ইঙ্গিত দিচ্ছে যে, ইসরায়েল বা মার্কিন পতাকাবাহী কোনো জাহাজ এখন আর এই পথে নিরাপদ নয়। ড্রোন বা মিসাইল হামলার ঝুঁকি এখন কেবল তাত্ত্বিক নয়, বরং এক বাস্তব আতঙ্কে পরিণত হয়েছে।
নিরাপত্তা ঝুঁকি ও বৈশ্বিক মেরুকরণ
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল যদি ইরানের এই হুঁশিয়ারিকে গুরুত্ব দিয়ে পাল্টা সামরিক ব্যবস্থা গ্রহণ করে, তবে এই ছায়াযুদ্ধ সরাসরি সংঘাতে রূপ নিতে পারে। ওয়াশিংটন ইতিমধ্যেই এই অঞ্চলে তাদের নৌ-উপস্থিতি বাড়িয়েছে। অন্যদিকে, ইরান তার জলসীমানাকে ‘দুর্ভেদ্য দুর্গ’ হিসেবে দাবি করে আসছে। এই টানটান উত্তেজনার ফলে কেবল জ্বালানি খাত নয়, বরং বৈশ্বিক জাহাজ চলাচল বা শিপিং লাইনেও বড় ধরনের পরিবর্তন আসতে পারে। অনেক কোম্পানি হয়তো ঝুঁকি এড়াতে দীর্ঘ পথ ঘুরে জাহাজ পাঠাবে, যার প্রভাব পড়বে আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্যে।
হরমুজ প্রণালি এখন কেবল একটি ভৌগোলিক সীমারেখা নয়, এটি একটি বিশ্বস্ত রাজনৈতিক হাতিয়ার। ইরানের এই ঘোষণার পর বল এখন পশ্চিমা দেশগুলোর কোর্টে। সংঘাত এড়িয়ে কীভাবে এই জলপথের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা যায়, সেটাই এখন দেখার বিষয়। তবে রৌমারীর সাধারণ মানুষের তেলের বাজার থেকে শুরু করে লন্ডনের স্টক এক্সচেঞ্জ—সবকিছুর ভাগ্যই এখন ঝুলে আছে এই ৩২ মাইল চওড়া জলপথের শান্ত থাকার ওপর। ইতিহাস সাক্ষী, হরমুজ প্রণালির ঢেউ একবার উত্তাল হলে তার কম্পন অনুভূত হয় পৃথিবীর প্রতিটি প্রান্তে।