
সাংবাদিকতার মূলমন্ত্র হলো ক্ষমতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করা এবং প্রান্তিক মানুষের কণ্ঠস্বর তুলে ধরা। প্রযুক্তির উন্নয়নে এই কাজ আজ অনেক সহজ হয়েছে; একটি স্মার্টফোনই এখন একেকটি চলমান নিউজরুম। কিন্তু প্রশ্ন উঠছে—বাংলাদেশের বর্তমান প্রেক্ষাপটে ‘মোবাইল সাংবাদিকতা’ কি তার মর্যাদা ধরে রাখতে পারছে, নাকি এটি ধীরে ধীরে ব্যক্তিগত গোপনীয়তা লঙ্ঘনের এক বিপজ্জনক হাতিয়ার হয়ে উঠছে?
বর্তমানে দেখা যাচ্ছে, অনেক ক্ষেত্রে মোবাইল ক্যামেরা তথ্য অনুসন্ধানের মাধ্যম না হয়ে মানুষের ব্যক্তিগত মুহূর্ত শিকারের যন্ত্রে পরিণত হয়েছে। জনসমাগমস্থলে একজন নারী হেঁটে যাচ্ছেন বা নিজের পোশাক ঠিক করছেন—এমন সময় হঠাৎ একাধিক মোবাইল ক্যামেরা তার দিকে তাক করা হয়। এরপর সেই ভিডিও কুরুচিপূর্ণ ক্যাপশনসহ সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে দেওয়া হয়। এখানে সংবাদ নয়, বরং ‘ভিউ’ এবং ‘ভাইরাল’ হওয়াই হয়ে ওঠে মূল লক্ষ্য।
এ ধরনের কর্মকাণ্ড সাংবাদিকতার নীতির পরিপন্থী। কারণ, সাংবাদিকতার কাজ তথ্য তুলে ধরা, কারও ব্যক্তিগত মর্যাদা ক্ষুণ্ন করা নয়। যখন কোনো লেন্স তথ্য অনুসন্ধানের পরিবর্তে কারও অপ্রস্তুত মুহূর্ত খুঁজে বেড়ায়, তখন তা আর সাংবাদিকতা থাকে না—তা হয়ে ওঠে ডিজিটাল হয়রানি।
সম্প্রতি বিভিন্ন স্থানে এমন ঘটনার উদাহরণ দেখা যাচ্ছে। শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, জনসমাগম কিংবা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযানের সময়ও অনেক ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সম্মান ও গোপনীয়তার বিষয়টি উপেক্ষিত হচ্ছে। আদালতের রায় হওয়ার আগেই সামাজিক মাধ্যমে ‘ক্যামেরার বিচারে’ অনেকের মান-সম্মান ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। মানুষের দুর্বলতা ও সংকটকে ‘কনটেন্ট’ বানানোর এই প্রবণতা সমাজের জন্য উদ্বেগজনক।
বিশেষজ্ঞদের মতে, গণমাধ্যমের স্বাধীনতা মানে এই নয় যে, ব্যক্তির সম্মান ক্ষুণ্ন করা যাবে। বরং দায়িত্বশীল সাংবাদিকতা হলো সত্য তুলে ধরার পাশাপাশি মানবিক মর্যাদা রক্ষা করা। কিছু ভুঁইফোড় অনলাইন প্ল্যাটফর্ম বা অনিবন্ধিত পেজ ‘নিউজ’ বা ‘টিভি’ নাম ব্যবহার করে যে ধরনের অপেশাদার আচরণ করছে, তা পুরো সাংবাদিকতা পেশার বিশ্বাসযোগ্যতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করছে।
বাংলাদেশের প্রচলিত আইনে ব্যক্তির গোপনীয়তা ও মর্যাদা রক্ষার বিধান রয়েছে। তবে এর কার্যকর প্রয়োগ এখন সময়ের দাবি। রাষ্ট্র, গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠান এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে এ বিষয়ে আরও সচেতন ও কঠোর হতে হবে। একইসঙ্গে সাধারণ নাগরিকদের মধ্যেও সচেতনতা বৃদ্ধি জরুরি।
সাংবাদিকতা কখনোই কারও দুর্বলতা বা বিব্রতকর মুহূর্তকে পুঁজি করে জনপ্রিয়তা অর্জনের মাধ্যম হতে পারে না। মোবাইল সাংবাদিকতা মানুষের কণ্ঠস্বর হয়ে উঠুক, আতঙ্কের কারণ নয়—এটাই আজকের সবচেয়ে বড় প্রত্যাশা।