
কুড়িগ্রামের বিস্তীর্ণ চরাঞ্চলে এবারও ঈদের আনন্দ ম্লান হয়ে পড়েছে দারিদ্র্য, নদীভাঙন ও অনিশ্চিত জীবনের কারণে। জেলার বিভিন্ন চরে এমন বহু পরিবার রয়েছে, যাদের ঘরে ঈদের দিন এক কেজি মাংসও জুটবে না। কোরবানি দেওয়া তো দূরের কথা, অনেকেই সন্তানদের নতুন পোশাক কিনে দেওয়ার সামর্থ্যও হারিয়েছেন।
সরেজমিনে ব্রহ্মপুত্র নদঘেঁষা ‘মাঝের চর’ এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, চারদিকে শুধু বেঁচে থাকার সংগ্রাম। নদীর বুক জেগে ওঠা এই চরে এখনো গড়ে ওঠেনি স্থায়ী সড়ক যোগাযোগ ব্যবস্থা। যাত্রাপুর নৌঘাট থেকে নৌকায় প্রায় এক ঘণ্টা পাড়ি দিয়ে পৌঁছাতে হয় সেখানে। চার বছর আগে জেগে ওঠা এই চরে নদীভাঙনে ক্ষতিগ্রস্ত অন্তত ৭০টি পরিবার নতুন করে বসতি গড়েছে। কিন্তু জীবনের কষ্ট কমেনি তাদের।
চরের বাসিন্দা আরমান আলী স্ত্রী আউলিয়া বেগম ও চার সন্তান নিয়ে মানবেতর জীবন কাটাচ্ছেন। তিনি সিরাজগঞ্জের একটি তাঁত কারখানায় কাজ করলেও বিদ্যুৎ বিভ্রাট ও কাজের অনিয়মিত পরিস্থিতির কারণে এবার আয় কম হয়েছে। ফলে সন্তানদের নতুন পোশাক তো নয়ই, ঈদের দিন সামান্য মাংস জোগাড় করাও অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে।
আরমান আলী বলেন,
“এবার কাজ খুব কম হয়েছে। হাতে কোনো টাকা নেই। বাচ্চাদের নতুন জামা কিনতে পারিনি। ঈদের দিন মাংস খাওয়াতে পারবো কিনা তাও জানি না।”
একই হতাশার কথা জানান জেসমিন আক্তার। তিনি বলেন,
“আমাদের চরে কোরবানি হয় না বললেই চলে। বাচ্চাদের একটু মাংস খাওয়াতে পারলে ভালো লাগতো।”
রাজু মিয়া নামের আরেক বাসিন্দা বলেন,
“এখানকার বেশিরভাগ মানুষই গরিব। কেউ কোরবানি দিতে পারে না। যাদের সামর্থ আছে তারা হয়তো অল্প কিছু মাংস কিনবে, বাকিরা সেটাও পাবে না।”
মাঝের চরের অধিকাংশ মানুষ কৃষিকাজের ওপর নির্ভরশীল। ধান, কাউন ও ভুট্টা চাষ করে কোনোমতে সংসার চালালেও উৎপাদন খরচ মেটানোর পর হাতে খুব সামান্য অর্থ থাকে। সেই আয় দিয়েই পুরো বছর টিকে থাকার সংগ্রাম করতে হয়।
স্থানীয়দের দাবি, গত তিন বছরেও এই চরে কেউ গরু কোরবানি দিতে পারেননি। গত বছর একটি স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন কিছু মাংস বিতরণ করেছিল। এবারও অনেক পরিবার সহায়তার আশায় দিন গুনছে।
শুধু মাঝের চর নয়, সদর উপজেলার পোড়ার চর, আইড়মারী, অষ্টআশির চর, উলিপুরের মুসারচর, জাহাজের আলগা ও দইখাওয়ার চরসহ জেলার সাড়ে চার শতাধিক চরের অধিকাংশ মানুষের অবস্থাই একই রকম।
জানা গেছে, কুড়িগ্রামের ৯ উপজেলার ওপর দিয়ে প্রবাহিত ১৬টি নদ-নদীর অববাহিকায় প্রায় ৪৬৯টি চর রয়েছে। এসব চরে বাস করেন পাঁচ লক্ষাধিক মানুষ। শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও যোগাযোগ ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতার পাশাপাশি দারিদ্র্য তাদের নিত্যসঙ্গী।
কুড়িগ্রাম চর উন্নয়ন ও বাস্তবায়ন পরিষদের আহ্বায়ক শফিকুল ইসলাম বেবু বলেন,
“চরের মানুষের কাছে ঈদ এখন আনন্দের চেয়ে টিকে থাকার লড়াই। সামনে বন্যার আশঙ্কাও রয়েছে। তাই অনেক পরিবার ভবিষ্যতের দুশ্চিন্তায় বেশি কষ্টে আছে।”
তিনি আরও বলেন,
“সমাজের বিত্তবান মানুষ যদি ঈদের আনন্দ ভাগাভাগি করে চরবাসীর পাশে দাঁড়ান, তাহলে অসংখ্য অসহায় পরিবারের মুখে হাসি ফুটতে পারে।”
এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা সোহেল হোসনাইন কায়কোবাদ জানান, ঈদ উপলক্ষে হতদরিদ্র মানুষের জন্য ভিজিএফের চাল বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে এবং স্বল্পমূল্যে টিসিবির পণ্য বিক্রি কার্যক্রমও চলমান রয়েছে। তবে চরাঞ্চলের মানুষের জীবনযাত্রা অত্যন্ত কষ্টকর উল্লেখ করে তিনি সমাজের বিত্তবানদের সহযোগিতার আহ্বান জানান।