
বর্তমান বৈশ্বিক বাস্তবতায় জ্বালানি সংকট এক বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত, বিশেষ করে সাম্প্রতিক ইরানকে ঘিরে উত্তেজনা বিশ্বব্যাপী জ্বালানি সরবরাহে অনিশ্চয়তা তৈরি করেছে। এর প্রভাব পড়েছে বাংলাদেশসহ উন্নয়নশীল দেশগুলোর অর্থনীতি, শিল্প ও পরিবহন খাতে। এমন পরিস্থিতিতে সংকটকে সুযোগে রূপান্তরের পথ খুঁজতে বিশ্বের নানা দেশের অভিজ্ঞতা গুরুত্বপূর্ণ দিকনির্দেশনা দিচ্ছে।
ইতিহাস বলছে, বড় সংকটই অনেক সময় নতুন উদ্ভাবনের জন্ম দেয়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় ইউরোপে তেলের ঘাটতি দেখা দিলে ‘উড গ্যাস’ চালিত গাড়ি চালু হয়, যেখানে কাঠ বা কয়লা থেকে উৎপাদিত গ্যাস জ্বালানি হিসেবে ব্যবহৃত হতো। একইভাবে ১৯৭০-এর দশকের তেল সংকটে কিউবা ব্যাপকভাবে সাইকেল ব্যবহার শুরু করে, যা শুধু জ্বালানি সাশ্রয়ই নয়, বরং জনস্বাস্থ্য উন্নয়নেও ভূমিকা রাখে।
নেদারল্যান্ডস সাইকেলকে পরিবহনের প্রধান মাধ্যম হিসেবে প্রতিষ্ঠা করে টেকসই উন্নয়নের এক অনন্য উদাহরণ তৈরি করেছে। জাপান ‘কুল বিজি’ উদ্যোগের মাধ্যমে বিদ্যুৎ সাশ্রয় করে দেখিয়েছে, ছোট নীতিগত পরিবর্তনও বড় ফল বয়ে আনতে পারে। অন্যদিকে আইসল্যান্ড নবায়নযোগ্য জ্বালানির দিকে ঝুঁকে প্রায় শতভাগ বিদ্যুৎ উৎপাদনে স্বনির্ভরতা অর্জন করেছে।
এছাড়া ব্রাজিল আখ থেকে ইথানল উৎপাদনের মাধ্যমে জ্বালানি নির্ভরতা কমিয়েছে, আর উত্তর কোরিয়া বিকল্প জ্বালানি হিসেবে মিথেন গ্যাস ব্যবহার করে পরিবহন সচল রেখেছে। এসব উদাহরণ প্রমাণ করে, সঠিক পরিকল্পনা ও স্থানীয় সম্পদের ব্যবহারই সংকট মোকাবিলার মূল চাবিকাঠি।
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটেও রয়েছে সম্ভাবনার বিশাল ক্ষেত্র। কৃষিভিত্তিক অর্থনীতি হওয়ায় ধানের তুষ, কৃষি বর্জ্য কিংবা জ্যাট্রোফা গাছ থেকে বায়ো-ডিজেল উৎপাদন করা সম্ভব। এছাড়া সোলার শক্তির ব্যবহার বাড়ানো, ভাসমান সোলার প্যানেল স্থাপন, রেলপথ উন্নয়ন এবং ই-বাইক চার্জিংয়ে সৌরবিদ্যুতের ব্যবহার জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে।
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, শিল্পকারখানায় অপচয় হওয়া তাপ পুনর্ব্যবহার (ওয়েস্ট হিট রিকভারি) এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে বিনিয়োগ বাড়ানো হলে দেশের জ্বালানি ব্যবস্থায় উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন আনা সম্ভব।
সবশেষে বলা যায়, জ্বালানি সংকট কেবল একটি সমস্যা নয়, বরং এটি নতুন সম্ভাবনার দ্বারও খুলে দেয়। সঠিক নীতি, গবেষণা ও উদ্ভাবনী উদ্যোগের মাধ্যমে বাংলাদেশও এই সংকট থেকে উত্তরণের পথ তৈরি করতে পারে। সংকট যত গভীরই হোক, সৃজনশীল চিন্তা ও বাস্তবভিত্তিক পদক্ষেপই পারে ভবিষ্যৎকে স্থিতিশীল ও টেকসই করে তুলতে।