চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম নয় মাসেই (জুলাই-মার্চ) বড় ধরনের রাজস্ব সংকটে পড়েছে দেশ। জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) প্রকাশিত হালনাগাদ তথ্যে দেখা যাচ্ছে, এই সময়ে লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় রাজস্ব ঘাটতি দাঁড়িয়েছে প্রায় ৯৭ হাজার ৯৯০ কোটি টাকা। বাংলাদেশের ইতিহাসে ৯ মাসের ব্যবধানে এত বিশাল অংকের ঘাটতি আর কখনো দেখা যায়নি।
গত অর্থবছরের পুরো সময়ে মোট ঘাটতি ছিল ৯২ হাজার ৬২৬ কোটি টাকা। এবার সেই রেকর্ড ভেঙে গেল অর্থবছর শেষ হওয়ার তিন মাস আগেই। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) ঋণের কঠিন শর্ত এবং সরকারের ক্রমবর্ধমান ব্যয় মেটানোর চাপে থাকা অর্থনীতিতে এই ঘাটতি এক অশনিসংকেত হিসেবে দেখা দিচ্ছে।
এনবিআরের তথ্য অনুযায়ী, জুলাই থেকে মার্চ পর্যন্ত তিন প্রধান খাতের কোনোটিতেই লক্ষ্যমাত্রা ছোঁয়া সম্ভব হয়নি:
• আয়কর: সবচেয়ে বেশি ঘাটতি এই খাতে, প্রায় ৪০ হাজার ৫০০ কোটি টাকা।
• ভ্যাট (মূসক): ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ৩৪ হাজার ৪০০ কোটি টাকা।
• আমদানি শুল্ক: এই খাতে ঘাটতির পরিমাণ ২২ হাজার ৯৭৩ কোটি টাকা।
নয় মাসে এনবিআরের আদায়ের লক্ষ্য ছিল ৩ লাখ ৮৫ হাজার ৮৫২ কোটি টাকা, যার বিপরীতে আদায় হয়েছে মাত্র ২ লাখ ৮৭ হাজার ৬৬২ কোটি টাকা। যদিও আদায়ের প্রবৃদ্ধি প্রায় ১১ শতাংশ, কিন্তু বিশাল লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় তা সামান্য।
অন্তর্বর্তী সরকারের পর ক্ষমতায় আসা বিএনপি নেতৃত্বাধীন নতুন সরকারের জন্য এই বিশাল রাজস্ব ঘাটতি এখন প্রধান মাথাব্যথার কারণ। সংশোধিত বাজেট অনুযায়ী, অর্থবছরের বাকি তিন মাসে (এপ্রিল-জুন) এনবিআরকে আরও ২ লাখ ১৫ হাজার কোটি টাকা আদায় করতে হবে। অর্থাৎ, প্রতি মাসে গড়ে প্রায় ৭১ হাজার ৭১২ কোটি টাকা আদায় করা প্রয়োজন, যা বর্তমান বাস্তবতায় প্রায় অসম্ভব। উল্লেখ্য, চলতি অর্থবছরের কোনো মাসেই রাজস্ব আদায় ৩৭ হাজার কোটি টাকার বেশি হয়নি।
অর্থনীতিবিদ ও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা এই সংকটের পেছনে বেশ কিছু কারণ চিহ্নিত করেছেন:
১. ব্যবসায়িক মন্দা: মধ্যপ্রাচ্য সংকট এবং জ্বালানি তেলের দাম বাড়ায় আমদানিতে ভাটা পড়েছে। নতুন বিনিয়োগ থমকে যাওয়ায় ব্যবসা-বাণিজ্যের গতি শ্লথ।
২. সংস্কারের অভাব: অন্তর্বর্তী সরকারের নেওয়া রাজস্ব সংস্কারের উদ্যোগগুলো ঝুলে গেছে। এনবিআর বিলুপ্তির অধ্যাদেশটি নতুন সরকার সংসদে না তোলায় তা কার্যকারিতা হারিয়েছে।
৩. কাঠামোগত ত্রুটি: এনবিআর নিজেই নীতি তৈরি করে আবার নিজেই আদায় করে, যা জবাবদিহিতার অন্তরায় বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা।
৪. আইএমএফ-এর চাপ: ঋণের শর্ত হিসেবে জিডিপির ০.৫ শতাংশ অতিরিক্ত রাজস্ব আদায়ের বাধ্যবাধকতা থাকলেও তা পূরণ করা কঠিন হয়ে পড়ছে, যা ভবিষ্যতে বিদেশি ঋণের কিস্তি পাওয়াকে অনিশ্চিত করতে পারে।
এনবিআরের সাবেক চেয়ারম্যান মোহাম্মদ আবদুল মজিদ মনে করেন, বর্তমান প্রশাসনের কাঠামো দিয়ে এত বড় লক্ষ্য অর্জন অসম্ভব। তিনি বলেন, “রাজস্ব খাতের আমূল সংস্কার ছাড়া উপায় নেই। শুল্ক-কর কর্মকর্তাদের স্বেচ্ছাচারিতা বন্ধ এবং নীতিনির্ধারণী ও আদায় প্রক্রিয়া আলাদা করা জরুরি।”
বিদ্যমান পরিস্থিতিতে কর ফাঁকি রোধ, করজাল বৃদ্ধি এবং দুর্নীতি বন্ধে কঠোর পদক্ষেপ না নিলে অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে সরকারের খরচ মেটানো এবং উন্নয়ন প্রকল্প চালু রাখা কঠিন হয়ে পড়বে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।