
দেশের উচ্চশিক্ষার সবচেয়ে বড় বিদ্যাপীঠ জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ে ২০২৫-২০২৬ শিক্ষাবর্ষের ১ম বর্ষ স্নাতক (সম্মান) শ্রেণির ভর্তি পরীক্ষা আজ ২৫ এপ্রিল, ২০২৬ (শনিবার) সকাল ১১টা থেকে দুপুর ১২টা পর্যন্ত অনুষ্ঠিত হবে। সারাদেশে ১৩৮টি কেন্দ্রে প্রায় ৪.৫৩ লাখের বেশি শিক্ষার্থী এই এমসিকিউ (MCQ) পদ্ধতিতে পরীক্ষায় অংশ নেবেন, যা ৮৮০টি কলেজে ভর্তির জন্য অনুষ্ঠিত হচ্ছে। তবে, এ বছর এক নজিরবিহীন চিত্র দেখা যাচ্ছে। যেখানে প্রতি বছর একটি আসনের বিপরীতে ডজনখানেক শিক্ষার্থী লড়াই করে, সেখানে এবার আসন সংখ্যার তুলনায় আবেদনকারীর সংখ্যাই কম। সম্প্রতি প্রকাশিত এক তথ্যে দেখা গেছে, এ বছর মোট ৪ লাখ ৫২ হাজার ৮৭৫টি আসনের বিপরীতে পরীক্ষায় অংশ নিচ্ছেন ৪ লাখ ৫৩ হাজার ১৪৮ জন শিক্ষার্থী।
গাণিতিক হিসেবে প্রতি আসনের বিপরীতে পরীক্ষার্থীর সংখ্যা মাত্র ১.০০১ জন। অর্থাৎ, প্রায় প্রতিটি আবেদনকারী শিক্ষার্থীর জন্যই একটি করে আসন নিশ্চিত রয়েছে।
ছবির তথ্য ও সাম্প্রতিক উপাত্ত বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়:
• মোট আসন সংখ্যা: ৪,৫২,৮৭৫টি
• মোট পরীক্ষার্থী/আবেদনকারী: ৪,৫৩,১৪৮ জন
• অতিরিক্ত পরীক্ষার্থী: মাত্র ২৭৩ জন
এই পরিসংখ্যান ইঙ্গিত দিচ্ছে যে, এ বছর জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ে কার্যত কোনো “ভর্তি যুদ্ধ” নেই। মূলত আবেদন করলেই পছন্দের বিষয় না হলেও কোনো না কোনো কলেজে ভর্তির সুযোগ পাওয়ার পথ প্রশস্ত রয়েছে।
শিক্ষা বিশ্লেষকদের মতে, বেশ কিছু সুনির্দিষ্ট কারণে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতি শিক্ষার্থীদের আগ্রহের এই ভারসাম্যহীনতা তৈরি হয়েছে:
১. কারিগরি ও বিশেষায়িত শিক্ষার দিকে ঝোঁক: বর্তমানে সাধারণ অনার্স বা ডিগ্রির চেয়ে শিক্ষার্থীরা নার্সিং, ডিটিএম (ডিপ্লোমা) এবং বিভিন্ন শর্ট-কোর্স বা স্কিল-ভিত্তিক শিক্ষার দিকে বেশি ঝুঁকছেন।
২. বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের বিস্তার: ঢাকাসহ বিভাগীয় শহরগুলোতে মানসম্মত বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা বৃদ্ধি পাওয়ায় স্বচ্ছল পরিবারের শিক্ষার্থীরা সেদিকে চলে যাচ্ছেন।
৩. কর্মসংস্থানের অভাব: জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পাস করা বিপুল সংখ্যক শিক্ষার্থীর বেকারত্বের হার বাড়তে থাকায় সাধারণ শিক্ষার প্রতি এক ধরণের অনীহা তৈরি হয়েছে।
৪. সেশন জট ও প্রশাসনিক দীর্ঘসূত্রিতা: যদিও সেশন জট অনেকটা কমে এসেছে, তবুও এখনো শিক্ষার্থীদের মধ্যে একাডেমিক ক্যালেন্ডার নিয়ে কিছুটা সংশয় কাজ করে।
জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে সারাদেশে প্রায় ২,২৭৪টি কলেজ রয়েছে। আসন ও পরীক্ষার্থীর এই পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, নামী সরকারি কলেজগুলোতে তীব্র প্রতিযোগিতা থাকলেও মফস্বল বা জেলা শহরের বেসরকারি কলেজগুলোতে অনেক আসন খালি পড়ে থাকার আশঙ্কা রয়েছে। এতে করে ওইসব কলেজের অস্তিত্ব সংকটে পড়ার সম্ভাবনা দেখছেন সংশ্লিষ্টরা।
শিক্ষা বিশেষজ্ঞ ড. আনিসুর রহমান বলেন, “আসন খালি থাকা কোনো সুখবর নয়। এটি প্রমাণ করে যে আমাদের সাধারণ উচ্চশিক্ষা ব্যবস্থা শ্রমবাজারের সাথে তাল মেলাতে পারছে না। জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়কে এখন সংখ্যার চেয়ে শিক্ষার মানের দিকে বেশি নজর দিতে হবে এবং কারিগরি বিষয়গুলো অন্তর্ভুক্ত করতে হবে।”
জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ে আসন অনুযায়ী শিক্ষার্থী কমে যাওয়ার এই প্রবণতা উচ্চশিক্ষার নীতি-নির্ধারকদের জন্য একটি বড় বার্তা। আগামীতে গতানুগতিক অনার্স কোর্সের পরিবর্তে যুগের সাথে তাল মিলিয়ে আধুনিক ও কর্মমুখী কারিকুলাম প্রণয়ন না করলে এই সংকট আরও ঘনীভূত হতে পারে।