
২০২৩ সালের ২৪ জুলাই বাংলাদেশের ২২তম রাষ্ট্রপতি হিসেবে দায়িত্ব নেন মো. সাহাবুদ্দিন। রাষ্ট্রপতির মেয়াদে আওয়ামী লীগ সরকারের পাশাপাশি অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান এবং সর্বশেষ বিএনপি সরকারের প্রধানকে শপথবাক্য পাঠ করান তিনি। যদিও দায়িত্বভার গ্রহণের পর থেকেই তাকে ঘিরে রাজনৈতিক বিতর্ক থেমে থাকেনি।
তবে ২০২৪ সালের জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের সময়ে সাংবিধানিক ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। কিন্তু এর পরেই বিভিন্ন গণমাধ্যমে দেওয়া তার একাধিক সাক্ষাৎকার নতুন করে বিতর্কের জন্ম দেয়। এসব বিতর্ক সত্ত্বেও সাংবিধানিক ধারাবাহিকতার স্বার্থে ক্ষমতাচ্যুত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনারই নিয়োগ দেওয়া রাষ্ট্রপতির পদে বহাল থাকেন তিনি।
ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট দেশ ছেড়ে পালিয়ে যেতে বাধ্য হন শেখ হাসিনা। এই সময় দেশে তৈরি হয় এক চরম সাংবিধানিক ও রাজনৈতিক সংকট। তবে এই সংকট থেকে উত্তরণে কেন্দ্রীয় চরিত্র হয়ে ওঠেন রাষ্ট্রপতি।
মূলত সাংবিধানিক শূন্যতা দূর করতে পরদিনই সংসদ ভেঙে দেন রাষ্ট্রপতি মোহাম্মদ সাহাবুদ্দিন। সংবিধানের ১০৬ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের পরামর্শে, ৮ আগস্ট শপথ পাঠ করান অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসকে। ওই দিনই রাষ্ট্রপতি মোহাম্মদ সাহাবুদ্দিনের কাছে শপথ নেন অন্তর্বর্তী সরকারের অন্যান্য উপদেষ্টারাও।
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট সাবেক প্রধানমন্ত্রীর দেশত্যাগ, এরপর দিনভর নানা উত্তেজনা ও ঘটনাপ্রবাহের পর রাতে জাতির উদ্দেশে ভাষণ দেন রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন। তিনি বলেছিলেন, পালিয়ে যাওয়ার আগে তার কাছে পদত্যাগপত্র জমা দিয়েছেন শেখ হাসিনা এবং তিনি তা গ্রহণও করেছেন।
কিন্তু বিপত্তি বাঁধে অভ্যুত্থানের আড়াই মাস পর। একটি জাতীয় দৈনিকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে এক বড় বিতর্কের জন্ম দেন রাষ্ট্রপতি। তিনি দাবি করেন, শেখ হাসিনার পদত্যাগের ‘দালিলিক কোনো প্রমাণ’ তার কাছে নেই। এতেই ক্ষোভে ফেটে পড়েন অভ্যুত্থানকারীরা। তার পদত্যাগ দাবি করে শুরু হয় বিক্ষোভ, ঘেরাও করা হয় বঙ্গভবন। রণক্ষেত্রে পরিণত হয় রাষ্ট্রপতির বাসভবন এলাকা।
তবে এমন বিক্ষোভের মুখেও তাৎক্ষণিক তাকে অপসারণের উদ্যোগ নেয়নি অন্তর্বর্তী সরকার। যদিও এই বক্তব্যের তীব্র প্রতিক্রিয়া জানিয়েছিলেন তৎকালীন আইন উপদেষ্টা আসিফ নজরুল। রাষ্ট্রপতির বক্তব্যকে ‘মিথ্যাচার’ বলে আখ্যায়িত করেন তিনি।
সেই সময় আলোচনা ছিল, তখন রাষ্ট্রপতিকে অপসারণ করা হলে সাংবিধানিক সংকট তৈরি হতো। এমন শঙ্কা থেকেই ওই সময় মো. সাহাবুদ্দিনকে সরানোর বিরোধিতা করেছিল বিএনপি।
এরপর নানা আলোচনা-সমালোচনার মধ্যেও স্বপদে বহাল থাকেন রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন। ২০২৬ সালের শুরুর দিকে নির্বাচনের মাধ্যমে সরকার গঠিত হওয়ার পরও, শপথ পাঠ করান নতুন সরকারের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এবং তার মন্ত্রিপরিষদকেও। তবে রাষ্ট্রপতিকে নিয়ে তখনও কমেনি বিতর্ক।
সরকার গঠনের পর সংসদীয় রেওয়াজ অনুযায়ী ত্রয়োদশ সংসদের প্রথম অধিবেশনে রাষ্ট্রপতির ভাষণ ঘিরেও সরকার ও বিরোধী দলের মধ্যে তৈরি হয় চরম উত্তেজনা। রাষ্ট্রপতিকে ‘জুলাই গাদ্দার’ আখ্যা দিয়ে অধিবেশন থেকে ওয়াকআউট করেন বিরোধী দলের সদস্যরা। কিন্তু সাংবিধানিক বিধি রক্ষায় তখনও রাষ্ট্রপতিকে সমর্থন দেয় সরকারি দল।
এরই মধ্যে ধীরে ধীরে রাষ্ট্রীয় নানা অনুষ্ঠানে যোগ দিতে দেখা যায় রাষ্ট্রপতিকে। যা অন্তর্বর্তী সরকারের আগের দেড় বছরে দেখা মেলেনি। বিভিন্ন গণমাধ্যমে দেওয়া সাক্ষাৎকারে ওই সময়ে একরকম গৃহবন্দি থাকারও অভিযোগ করেছিলেন তিনি। অনেকেই ধারণা করেছিলেন, হয়তো পূর্ণ মেয়াদেই রাষ্ট্রপতির পদে থাকবেন তিনি।
কিন্তু এরই মধ্যে ৯ মে চিকিৎসার জন্য লন্ডনে যান রাষ্ট্রপতি। ফিরে আসেন ১৮ মে। এরপর থেকেই সরকারের সঙ্গে শীতল হতে শুরু করে রাষ্ট্রপতির সম্পর্ক। হঠাৎ করেই রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিনের পদত্যাগের ইস্যুটি আলোচনায় আসে বিভিন্ন গণমাধ্যমে।
এরপরই আজ গুরুতর শারীরিক অসুস্থতার কারণ দেখিয়ে বাংলাদেশের রাষ্ট্রপ্রধানের পদ থেকে সরে দাঁড়িয়েছেন মো. সাহাবুদ্দিন। জাতীয় সংসদের স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদের কাছে পদত্যাগপত্র জমা দেন তিনি।
মো. সাহাবুদ্দিনের পথচলা
১৯৪৯ সালে পাবনা শহরের জুবিলি ট্যাঙ্কপাড়ায় (শিবরামপুর) জন্মগ্রহণ করেন মো. সাহাবুদ্দিন। শরফুদ্দিন আনছারী ও খায়রুন্নেসা তার বাবা-মা। ১৯৬৬ সালে এসএসসি পাস করেন তিনি। আর ১৯৬৮ সালে পাবনার এডওয়ার্ড কলেজ থেকে এইচএসসি পাস করেন। বিএসসি পাস করেন ১৯৭১ সালে (১৯৭২ সালে পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়)।
পরে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ১৯৭৪ সালে মনোবিজ্ঞানে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন। পরের বছর ১৯৭৫ সালে পাবনার শহীদ অ্যাডভোকেট আমিনুদ্দিন আইন কলেজ থেকে এলএলবি ডিগ্রি অর্জন করেন।
ছাত্রজীবনে পাবনা জেলা ছাত্রলীগের সক্রিয় কর্মী ও সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করা মো. সাহাবুদ্দিন মুক্তিযুদ্ধে সক্রিয়ভাবে অংশ নেন। স্বাধীন বাংলা ছাত্রপরিষদের জেলা সভাপতি হিসেবে পাবনায় স্বাধীন বাংলার পতাকা উত্তোলনকারী তিনি।
১৯৭৫ সালে বঙ্গবন্ধু হত্যার প্রতিবাদ করায় ২০ আগস্ট সামরিক আইনের সাত ধারায় আটক হয়েছিলেন তিনি। আর তখন প্রায় তিন বছর কারারুদ্ধ ছিলেন মো. সাহাবুদ্দিন।
কারাভোগের পর মুক্ত হয়ে মো. সাহাবুদ্দিন পাবনা জেলা আওয়ামী লীগের প্রচার সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেন। পাবনা জেলা আইনজীবী সমিতির সদস্য হিসেবে আইন পেশায়ও যোগ দেন। তিনি ১৯৮২ সাল পর্যন্ত এ পেশায় যুক্ত ছিলেন। পরে ১৯৮২ সালে বিসিএস (বিচার) ক্যাডার হিসেবে যোগ দেন। বিচারাঙ্গনে বিভিন্ন পদে চাকরি শেষে ২৫ বছর পর ২০০৬ সালে জেলা ও দায়রা জজ হিসেবে অবসর নেন তিনি