
সিলেটকে সুন্দর, পরিচ্ছন্ন ও নিরাপদ নগরী গড়ে তুলতে স্বল্পমেয়াদি ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা বাস্তবায়নের ঘোষণা দিয়েছেন সিলেট সিটি করপোরেশনের (সিসিক) প্রশাসক আব্দুল কাইয়ূম চৌধুরী।
শনিবার ( ১৪ মার্চ) দৈনিক কালবেলার প্রতিনিধির সঙ্গে আলাপকালে নবনিযুক্ত এ প্রশাসক উন্নয়নমূলক নানা পরিকল্পনার কথা তুলে ধরেন।
আব্দুল কাইয়ূম চৌধুরী বলেন, মশা নিধন, খাল-নর্দমা পরিষ্কার, জলাবদ্ধতা নিরসন, যানজট কমানো এবং নাগরিক সেবা দ্রুত মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়াই হবে প্রধান অগ্রাধিকার।
সিসিকের দায়িত্ব নেওয়ার পর আপনার সময় কেমন কাটছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, দায়িত্ব গ্রহণের প্রথম দিন আনুষ্ঠানিকতার মধ্য দিয়ে কাটলেও ইতোমধ্যে সিসিকের বিভিন্ন বিভাগের কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করে নগরের সমস্যা ও সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা হয়েছে। আমি দায়িত্ব পাওয়ার পর থেকে নগরীর বিভিন্ন এলাকা পরিদর্শন করেছি। এলাকার সমস্যাগুলো দ্রুত সমাধান করা হচ্ছে। নাগরিকদের চাহিদাকে গুরুত্ব দিয়ে স্বল্পমেয়াদি কিছু পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। সব বিভাগকে নির্দেশ দিয়েছি, যাতে নাগরিকরা দ্রুত ও কার্যকর সেবা পান। অতীতের যে কোনো সময়ের তুলনায় এখন নাগরিকরা আরও ভালো সেবা পাবেন, এটাই আমাদের লক্ষ্য।
সিলেট নগরবাসীকে মশার উপদ্রব থেকে মুক্ত করতে আপনার পরিকল্পনা কী? এ প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, নগরের অন্যতম বড় সমস্যা মশার উপদ্রব, খাল-নর্দমা ভরাট হয়ে যাওয়া এবং জলাবদ্ধতা। এসব সমস্যা সমাধানে কার্যক্রম শুরু হয়েছে। সপ্তাহ খানেকের মধ্যেই এর দৃশ্যমান অগ্রগতি নগরবাসী দেখতে পাবেন।
অল্প বৃষ্টি হলে সিলেট নগর তলিয়ে যায়, এ নিয়ে আপনার কোনো পরিকল্পনা আছে কি না? এ বিষয়ে তিনি বলেন, বর্ষা মৌসুমে যাতে নগরের বাসাবাড়িতে পানি না ওঠে সেজন্য খাল ও ছড়া পরিষ্কার, ময়লা অপসারণ এবং পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা জোরদার করা হবে। পাশাপাশি বিশুদ্ধ পানির সরবরাহ নিশ্চিত করার উদ্যোগ নেওয়া হবে।
সিলেট নগরীর যানজট ও ফুটপাত দখলের বিষয়ে তিনি বলেন, ‘ফুটপাত দখল করে কোনো দোকানপাট বসতে দেওয়া হবে না। অবৈধ অটোরিকশা বা বেবি স্ট্যান্ড নগরের মধ্যে করতে অনুমতি দেওয়া হবে না। যানজট নিরসনে সিলেট মেট্রোপলিটন পুলিশের সঙ্গে সমন্বয় করে পদক্ষেপ নেওয়া হবে।’
নগরের সৌন্দর্যবর্ধন ও পরিবেশ উন্নয়নের বিষয়ে আপনার কোনো পরিকল্পনা আছে কি না? এ নিয়ে তিনি বলেন, পরিবেশবান্ধব একটি উন্মুক্ত পার্ক তৈরির বিষয়ে চিন্তাভাবনা চলছে, যেখানে মানুষ হাঁটাচলা করতে পারবে এবং স্বস্তির পরিবেশ পাবে। এটি বাস্তবায়ন হলে নগরের চেহারায় ইতিবাচক পরিবর্তন আসবে বলে।
সিটি করপোরেশনের সম্পত্তি ও খাল-ছড়া দখলের বিষয়ে তিনি বলেন, সিসিকের জমি বা সম্পত্তি যারা দখল করে রেখেছে তাদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে। দখল করা সম্পত্তি পুনরুদ্ধারে অভিযান চালানো হবে।
নগরের ঝুঁকিপূর্ণ ভবনগুলো নিয়ে আপনার কোনো পরিকল্পনা আছে কি না ? এ প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, নগরের ঝুঁকিপূর্ণ ভবনগুলো চিহ্নিত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। যাতে কোনো দুর্ঘটনা না ঘটে।
সিসিকের আয় বৃদ্ধির প্রসঙ্গে প্রশ্ন করলে তিনি বলেন, অন্যান্য সিটি করপোরেশনের মতো আয়ের বড় প্রকল্প সিসিকের নেই। বর্তমানে মূলত হোল্ডিং ট্যাক্স ও কিছু ভাড়ার ওপর নির্ভর করেই প্রতিষ্ঠান পরিচালিত হচ্ছে। ভবিষ্যতে আয়ের নতুন উৎস তৈরি করতে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা ও নগরবাসীর সঙ্গে আলোচনা করে উদ্যোগ নেওয়া হবে।
সিলেট নগরীতে ফুট ওভারব্রিজ নির্মাণ করা হয়েছে কিন্তু মানুষ ব্যবহার করে না এ বিষয়ে তিনি বলেন, ‘আমরা দেখব যে ওভারব্রিজ মানুষের সুবিধার্থে করা হয়েছে কি না, রাজনৈতিক বিবেচনায় করা হয়েছে এগুলো আমরা দেখি, আমাদের ইঞ্জিনিয়ারিং ডিপার্টমেন্টকে আমরা বলব যে এই ফুটপাতের ব্যবহার কেন হচ্ছে না বা কেন করা হয়েছিল এসব বিষয় দেখে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
সিলেট সিটি করপোরেশনের আয়তন বাড়াবেন কি না? এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘না, কিছুদিন আগে সিটি করপোরেশন সম্প্রসারণ করা হয়েছে। ২৭টি ওয়ার্ড ছিল, এখন ৪২টা হয়েছে। এ মুহূর্তে আমাদের সিটি করপোরেশনের আওতা বৃদ্ধি করার কোনো পরিকল্পনা নেই। যেগুলো নতুন ওয়ার্ড অন্তর্ভুক্ত হয়েছে, সেসব ওয়ার্ডে কীভাবে নাগরিক সুযোগ-সুবিধা দেওয়া যায়, সেই বিষয় নিয়েই আমরা এখন কাজ করব।’
হকার উচ্ছেদ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, হকারদের লালদিঘী মাঠে যেতেই হবে। সুযোগ পেলেই ওরা ফুটপাত থেকে শুরু করে সড়ক পর্যন্ত দখল করে ফেলে। আমরা কিনব্রিজ থেকে আম্বরখানা পয়েন্ট পর্যন্ত একজন হকারও দেখতে চাই না। শিগগির হকার নেতাদের ডেকে কঠোর বার্তা দেওয়া হবে। অতীতে উন্নয়নের নামে অপরিকল্পিত অনেক কাজ হয়েছে। এতে সেবার পরিবর্তে দুর্ভোগ বেড়েছে, অপচয় হয়েছে অর্থের।
আগামীর উন্নয়ন কতটুকু পরিকল্পিত হবে জানতে চাইলে তিনি বলেন, সিলেট শহরে অনেক অপরিকল্পিত কাজ হয়েছে। বক্স ড্রেনগুলোর ওপর কোনো পরিকল্পনা ছাড়াই পেভমেন্ট টাইলস বসানো হয়েছে। ম্যানহোল মার্ক রাখা হয়নি। এখন ড্রেন পরিষ্কার করার প্রয়োজন হচ্ছে, তখন টাইলস ভেঙে ম্যানহোল খুঁজতে হচ্ছে। এগুলো অর্থের অপচয় ছাড়া কিছুই নয়। আগামীতে প্রকল্পের নামে এভাবে আর অর্থের অপচয় যাতে না হয় এ ব্যাপারে সতর্ক থাকব।
সিসিকের নগরবাসীর সহযোগিতা চান কি না ? এ প্রশ্নে তিনি বলেন, ‘এটা আপনাদের নগরী। এ নগরকে সুন্দর রাখতে সবাইকে দায়িত্ব নিতে হবে। আমি নাগরিকের অভিযোগ সাদরে গ্রহণ করব এবং সবাইকে সঙ্গে নিয়ে কাজ করতে চাই।’ তিনি আশা প্রকাশ করেন, নগরবাসীর সহযোগিতা এবং সংশ্লিষ্ট সবার সমন্বয়ে একটি পরিচ্ছন্ন, বাসযোগ্য ও নিরাপদ সিলেট গড়ে তোলা সম্ভব হবে।